মাজহার মান্না, কিশোরগঞ্জ: জেলার ১৩টি উপজেলা, ৮টি পৌরসভা ও ১০৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কিশোরগঞ্জ জেলায় প্রায় ৩০ লাখ লোকের বসবাস। ২০২৪ বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর এ জেলায় পাল্টে গেছে রাজনীতির হিসাব-নিকাশ। বর্তমানে দলটির নেতারা কেউ আছেন আত্মগোপনে, আর কেউ কারাগারে। এরই মধ্যে দলের জেলা কার্যালয় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে জাতীয় পার্টির সারা জেলায় কোনো রাজনৈতিক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। গত বছরের এ সময়েগুলোয় জেলা বিএনপির কার্যালয়ে ছিল নীরবতা। নেতাকর্মীরা ভয়ে সেখানে বসতে পারতেন না। একই অবস্থা ছিল জেলা জামায়াতে ইসলামীর কার্যালয়ের। এখন এই দল দুটির কার্যালয় সবসময়ই জমজমাট। ফুরফুরে মেজাজে থাকা নেতাকর্মীদের পদচারণে মুখর থাকে যেন দলীয় কার্যালয়গুলো। বিএনপির যেসব নেতাকর্মী নানা ঝামেলা এড়াতে দলের কর্মসূচি থেকে দূরে থাকতেন, তাঁরাও এখন কোনো কর্মসূচি হলে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। এমন পরিস্থিতিতে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে মাঠ গোছাতে নেমে পড়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। এখন সম্ভাব্য প্রার্থী ও নেতাকর্মীদের পদচারণায় কিশোরগঞ্জের ৬টি সংসদীয় আসনে যেন বেশ উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। ভোটাররাও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য।
বিগত ১৯৯১ সালে জেলার ৭টি আসনের মধ্যে বিএনপি পেয়েছিল ৫টি, আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ২টি। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে বিএনপি ২টি আসনে জয়ী হয়। তবে আওয়ামী লীগ ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে সদর আসনসহ বেশ কয়েকটি আসনে নিজেদের শক্ত অবস্থান ধরে রাখে। বর্তমানে জেলার মোট আসন সংখ্যা ৬টি। এখন পর্যন্ত কিশোরগঞ্জের কোনো আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর কোনো প্রার্থী জয়লাভ করতে পারেনি। তবে এইবার ইসলামী দলগুলোর একক প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনের জন্য বেশ জোরেশোরে প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিগত সময়ে মাঠের রাজনীতিতে কোণঠাসা থাকলেও আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকে জামায়াতে ইসলামীতে চাঙ্গাভাব বিরাজ করছে। গণসংযোগ আর প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে দলটির নেতাকর্মীরা সরব রাজনীতির মাঠে। উজ্জীবিত জামায়াতের কর্মী-সমর্থকরাও। অন্যদিকে প্রতিটি আসনে বিএনপির অর্ধডজনের মতো নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। এরই মধ্যে ৬টি আসনের মধ্যে ৪টিতে বিএনপি দলীয় সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম দলটি কেন্দ্রীয়ভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এসবের মধ্যে কিশোরগঞ্জ-২ ও কিশোরগঞ্জ-৪ আসনে মনোনয়নবঞ্চিত প্রার্থী ও সমর্থকেরা সংসদীয় আসনগুলোতে ঘোষিত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে মনোনয়ন বদলের দাবিতে নানা কর্মসূচি পালন করেছেন। এছাড়া জোটবদ্ধ রাজনীতির কারণে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপি থেকে কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি, স্থগিত রাখা হয়েছে। কিশোরগঞ্জ জেলার “রাজনীতির হালচাল” নিয়ে আজ থাকছে প্রথম পর্ব-
কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম):
হাওড় অধ্যুষিত ইটনা-মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম এই তিন উপজেলা নিয়ে গঠিত কিশোরগঞ্জ-৪ আসন থেকে ৭ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সাবেক রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ। তিনি এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিকল্পে রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণসহ সার্বিক উন্নয়নে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছেন।
কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে এ আসনে রাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছে। বর্তমানে সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও পরিবারের নিকটাত্মীয়স্বজন কেউ সংসদীয় এলাকায় নেই।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সমসাময়িক রাজনৈতিক বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান। তিনি বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা (বর্তমানে পদ স্থগিত)। আপাদমস্তক মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা নাটকীয়তায় বিভিন্ন সময় আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন। বর্তমানে সারা জেলায় তাঁর মাপের হেভিওয়েট রাজনীতিক এখন আর মাঠে নেই। তাছাড়া ব্যক্তি ইমেজের কারণেও এই আসনে অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানের বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে। স্থানীয় নেতা কর্মীদের দৃঢ় বিশ্বাস জনপ্রিয়তার দিক থেকে এই আসনে অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানের ধারেকাছেও কেউ নেই,তিনিই হচ্ছেন আগামীর এমপি। নির্বাচন প্রসঙ্গে ইটনা উপজেলা বিএনপির সভাপতি এস এম কামাল হোসেন বলেন- বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান জনমানুষের নেতা। সারাজীবন তিনি হাওরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নের কথা ভেবেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ ফজলুর রহমানের সঙ্গে প্রতিদন্ধীতার করার মতো বিকল্প কেউ আছেন বলে মনে করি না।
এদিকে ফজলুর রহমানকে কেন্দ্র করে বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে ফজলুর রহমানের মনোনয়ন নিয়ে নানা অভিযোগ ও মন্তব্য করেছেন এ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী সাবেক জেলা প্রশাসক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহিম মোল্লা এবং জাতীয়তাবাদী হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট সুরঞ্জন ঘোষ। গত ৮ নভেম্বর সুরঞ্জন ঘোষ নিজের ফেসবুক আইডিতে আড়াই মিনিটের এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘আওয়ামী লীগের হাসিনার প্রেতাত্মাদেরকেই বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে, এটা মেনে নেওয়া যায় না। শেখ হাসিনার সঙ্গে কে কত ঘণ্টা কথা বলেছেন, কে কত টাকা লেনদেন করেছেন সব তথ্য-প্রমাণ তার কাছে আছে, যা সময়মতো প্রকাশ করা হবে’। এছাড়া আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী আব্দুর রহিম মোল্লা বাংলাদেশে একমাত্র বিতর্কিত ব্যক্তি অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানকে উল্লেখ করে তার প্রাথমিক মনোনয়ন বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। তিনি গত ১১ নভেম্বর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে এবং সম্প্রতি কিশোরগঞ্জে ডিসি অফিসের সামনে কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে এ দাবি জানিয়েছেন।
কিশোরগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপি-জামায়াতসহ আরও বেশ কয়েকটি দল মাঠে সক্রিয় রয়েছে। এলাকায় সভা-সমাবেশ, সামাজিক অনুষ্ঠান এবং পোস্টার-ব্যানারে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন। তবে এখানে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান ও জামায়াত নেতা অ্যাডভোকেট রোকন রেজা শেখ। এছাড়া এই আসনে প্রার্থী হয়েছেন ইসলামী আইনজীবী পরিষদের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সুপ্রীম কোর্টের সহকারী এটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট বিল্লাহ আহমাদ মজুমদার, জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সহ-সাধারণ সম্পাদক ও জেলা উদীচীর সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা খায়রুল ইসলাম ঠাকুর, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের শায়খ মাওলানা আনোয়ারুল ইসলাম এবং এনসিপির কেন্দ্রীয় সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) আকরাম হোসেন রাজ ও এনসিপির মিঠামইন উপজেলার সমন্বয়কারী মুরাদ মিয়া।
জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্যমতে, হাওড় অধ্যুষিত তিন উপজেলা ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রামের ২৪টি ইউনিয়ন নিয়ে কিশোরগঞ্জ-৪ আসন গঠিত। এখানে মোট ভোটার ৩ লাখ ৮২ হাজার ২৫২। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৯৬ হাজার ৮৪৩, নারী ভোটার ১ লাখ ৮৫ হাজার ৪০৮ এবং তৃতীয় লিঙ্গ ১ জন।
নির্বাচন প্রসঙ্গে জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার আইন বিভাগীয় সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট রোকন রেজা শেখ বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী সবসময়ই মানুষের কল্যাণে কাজ করছে। নির্বাচন সামনে রেখে হাওড়াঞ্চলের প্রতিটি ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালাচ্ছি। আশা করি জনগণ আমাদের সমর্থন করবে’।
তথ্যানুসন্ধান মতে, স্বাধীনতার পর থেকে এ আসনে ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের আবদুল হামিদ, ১৯৭৯ সালে বিএনপির ফরহাদ আহমেদ কাঞ্চন, ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের আবদুল হামিদ, ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির আবদুল লতিফ ভূঁইয়া নির্বাচিত হন। এছাড়া ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আবদুল হামিদ, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে সাবেক এই রাষ্ট্রপতির ছেলে রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক জয়ী হয়েছিলেন। তথ্যসূত্র-জনকন্ঠ
