সোশ্যাল মিডিয়া

জীবন আমার সঙ্গে কতোবার কানামাছি খেলেছে!

নরসুন্দা ডটকম   মে ৩, ২০১৮
জীবন আমার
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কখন বুঝবেন আপনার সবচে বড় ভাইটির যথেষ্ট বয়েস হয়ে গেছে? এবং তিনি বুড়ো হয়ে গেছেন?  যখন লক্ষ্য করবেন তাঁর চেহারায় আপনার বাবার মুখটা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। 

আমার অগ্রজ মিজানুর রহমান। ডাক নাম সিপন। সরকারি চাকরি থেকে মাত্রই অবসরে গেছেন। হজ্জ্বটজ্জ্ব করে মুখভর্তি শাদা দাঁড়ি শোভিত হবার আগে আমি তাঁর চেহারায় বেশ কয়েকবার বাবার অবয়ব দেখে চমকে উঠেছি। কিন্তু তাঁকে বলিনি সেকথা।

গেলো পরশুদিন, ঢাকায় পালিত হচ্ছে শবে বরাত। আমি ফোনে কথা বলেছি বড় ভাইয়ের সঙ্গে। এর আগে, মা যখন কথা বলতে সক্ষম ছিলেন, শবে বরাতে আমি কথা বলতাম মায়ের সঙ্গে। তখন আলাপ হতো তাঁর বানানো আটার রুটি-চালের রুটি, সুজি আর বুটের হালুয়া কিংবা পৃথিবীর সেরা স্বাদের পোলাও-ঝাল মাংসের আইটেম নিয়ে। শুনে মা দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন–নাগালের বাইরে থাকা তাঁর হতভাগ্য ছেলেটার জন্যে। কারণ এই ছেলেটার খুব প্রিয় ছিলো ওই খাবারগুলো!

বড়ভাইকে হালুয়া-রুটির কথা জিজ্ঞেস করতেই বললেন–এখন আর আগের মতো রুটি-হালুয়া বানানো হয় না ঘরে ঘরে। শবে বরাত আর আগের মতো নেই। এটা পালনের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়েছে। হালুয়া রুটির চল উঠে গেছে তাঁর বাড়ি থেকেও।

শুনে মনটা খারাপই হলো। বড়ভাই তখন আজিমপুর কবরস্থানের উদ্দেশ্যে, রিকশায়। বাবা আর ছোটভাইয়ের কবরে দোয়া পড়তে যাচ্ছেন। আমার বড় ভাইটা বাঙালির পরিবারের চিরকালের ভালোমানুষ বড় ভাইয়ের আদলের।  পরিবার থেকে বিতাড়িত হলেও আমি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন লেখায় সাক্ষাৎকারে একমাত্র এই বড়ভাই সম্পর্কেই কিছু পজিটিভ কথা উচ্চারণ করতে পেরেছি।

চট্টগ্রামের মাহবুবুল হাসান তাঁর সম্পাদিত ‘ছড়া পত্রিকা’র ১৮তম সংখ্যাটি প্রকাশ করেছিলেন(ফেব্রুয়ারি ২০১৪) ‘লুৎফর রহমান রিটন সংখ্যা’ হিশেবে। বহু মহাজন লিখেছিলেন সেই সংখ্যায়, অকিঞ্চিৎকর আমাকে নিয়ে। সম্পাদক স্বয়ং নিয়েছিলেন বিশাল এক সাক্ষাৎকার। ওই সাক্ষাৎকারেও আমি আমার অগ্রজ মিজানের কথা বলেছিলাম। ওখান থেকে উদ্ধৃত করি–

”বাবা ছিলেন সরকারি চাকুরে। মা গৃহিনী। সাত ভাই দুই বোনের মধ্যে আমি তৃতীয়। সত্যি বলতে কি–লেখক হিশেবে পরিবারে আমি তেমন কোনো মূল্যই পাইনি। অন্যান্য অধিকাংশ লেখকের মতোই পরিবারে আমি ছিলাম অবহেলা, অবজ্ঞা আর উপহাসের বস্তু। একমাত্র অগ্রজ মিজানুর রহমান ছাড়া আমার লেখক-মর্যাদা ও সম্মানটাকে আর কেউ উপলব্ধিই করতে পারেনি। উৎসাহ-প্রেরণা বা সহযোগিতা পাইনি। উলটো তুচ্ছ তাচ্ছিল্যই জুটেছে হরদম। অবশ্য বড়ভাই মিজান একাই সবার অবহেলাকে মমতা দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছেন। ভালোবাসা দিয়ে পুষিয়ে দিয়েছেন।

আমার সমস্ত বইয়ের তিনি আগ্রহী সংগ্রাহক। আমার সমস্ত বইয়ের কপি তাঁর কাছে আছে। পত্রিকায় প্রকাশিত আমার সমস্ত লেখা ইন্টারভিউ আর ছবি তিনি যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখেন। একজন লেখকের বড়ভাই হবার গৌরবটুকু তাঁর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে প্রকাশিত হতে দেখি প্রায়ই।…জীবনের নানা সংকটে আমার এই বড় ভাইটি বাবার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।”

আমাদের ওয়ারির বাড়িতে সাহিত্যের আবহাওয়া একেবারেই ছিল না। কেউ উৎসাহও দিতেন না আমার লেখালেখি বিষয়ে। সরকারি চাকুরে বাবা চাইতেন আমি ইঞ্জিনিয়ার হই। শাদামাটা একটা মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মেছি আমি। বাবা মা এবং সাত ভাই দুই বোনের সংসারে আমি ছিলাম একটু অন্যরকম। ঝগড়া মারামারি কিংবা খাবার নিয়ে হইচই চ্যাঁচামেচির মধ্যে আমাকে পাওয়া যেতো না। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে যা ছিলো প্রাত্যহিক একটি ব্যাপার। সেই ছেলেবেলাতেই আমি আমার নিজস্ব আলাদা একটা ভুবন বেছে নিয়েছিলাম। যে ভুবনে ছবি আছে রঙ আছে হাসি আছে আনন্দ আছে। যে ভুবনটা স্বপ্ন আর বাস্তবতার মিশেলে তৈরি।

লেখালেখির সূচনায়, যারা আমার সমসাময়িক ছিল, তাদের সঙ্গে এক ধরণের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও ওপরে ওপরে সম্পর্কটা ছিলো বন্ধুর মতোই। এটাকে প্রফেশনাল জেলাসি ধরে নিলে সমস্যা নেই। তবে এই জেলাসিটা প্রকট হয়ে উঠলে সেটাকে আমলে না নিয়ে উপায় থাকে না। ডেল কার্নেগির একটা বইতে এইরকম একটা পরামর্শ ছিল যে–‘ক্ষতিকে লাভে রূপান্তরিত করো।’ আমি প্রকট জেলাসির ক্ষতিটাকে লাভে রূপান্তরিত করেছিলাম সেটাকে উৎসাহ হিশেবে ধরে নিয়ে। সমসাময়িক কতিপয় বন্ধু আমাকে রিভার্স উৎসাহ যোগান দিয়েছেন বিস্তর। এক হিশেবে তারাই আমার প্রধান উৎসাহদাতা।

বড়োদের উৎসাহও পেয়েছি আমি প্রচুর। দু’চারটে ব্যতিক্রম বাদে আধিকাংশ প্রবীনই আমাকে বিপুল স্নেহ আর ভালোবাসা যুগিয়েছেন। আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়েছেন। প্রশংসায় প্রশংসায় প্রাণিত করেছেন।  ঠাট্টাও সহ্য করেছি কতিপয় সিনিয়র লেখকের। কিন্তু তাতে দমে যাইনি। থমকে থাকিনি। তাঁদের পাশ কাটিয়ে ভিন্ন পথে হেঁটে গেছি। আমার বিরামহীন ক্লান্তিহীন চলার গতির সঙ্গে শেষমেশ ওরা পেরে ওঠেননি। ক্ষ্যান্ত দিয়েছেন এক পর্যায়ে। আর আমি এগিয়ে গেছি আমার অভিষ্ঠ লক্ষ্যের দিকে, ধিরে ধিরে। অপমানকে গায়ে না মেখে। অবজ্ঞাকে দুই পায়ে দলে।

তবে সবচে বেশি ঠাট্টা সহ্য করতে হয়েছে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে। আমি লেখালেখি করি বলে আমার ভাইবোনগুলো কতো অবজ্ঞা আর উপহাসই না করেছে আমাকে! ওরা ওদের অজ্ঞতা মূর্খতা আর ঠাট্টা-মশকরার আঘাতে আমার হৃদয় চূর্ণবিচূর্ণ করলেও আমি কখনোই ওদের সঙ্গে অসম লড়াই-এ অবতীর্ণ হইনি। মূর্খরা দ্রুত ঐক্যবদ্ধ হয়। আমাকে হেয়জ্ঞান করার ক্ষেত্রে আমার ভাইবোনগুলোর ঐক্য ছিল বিস্ময়কর। তবে ওদের ঠাট্টা মশকরাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমি যখন লেখক হিশেবে মাথা তুলে দাঁড়ালাম তখন ওরা আমার আশেপাশে নেই।

অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করে আমি একলা একা পথ চলেছি। রবি ঠাকুর আমাকে বলে দিয়েছিলেন, যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একল চলো রে…।
আমি তথাকথিত পরিবার বিতাড়িত একলা মানুষ। স্ত্রী আর এক কন্যাকে নিয়ে আমার ছোট্ট সাজানো সংসার। বাংলাদেশ থেকে বহু দূরে, আটলাটিকের এপারে, কানাডায়।

আমার ভাইবোনগুলো আড়ালে আবডালে আকারে ইঙ্গিতে এবং কখনো কখনো প্রকাশ্যে আমার কানে আসে এমত উচ্চকণ্ঠে– ‘হেহ্‌ বুদ্ধিজীবী’ বলে কতো উপহাস করেছে আমাকে! কষ্ট পেতাম যখন সেই উপহাস দলীয়ভাবেও উদযাপিত হতো।
বুক ভরা হাহাকার নিয়ে ভাইবোনের আদর-ভালোবাসা বঞ্চিত আমি চিরকাল একজন ভাইয়ের খোঁজ করেছি। একজন বোনের খোঁজ করেছি। অতিসম্প্রতি ভাই বলে বুকে জড়িয়ে ধরা একজন অনুজ পেছন থেকে ছুরি মেরে রক্তাক্ত করেছে আমাকে। এরপর থেকে কাউকে ভাই বলে জড়িয়ে ধরতেও ভয় পাই।

একমাত্র বড়ভাই মিজান ছাড়া কারো সঙ্গেই যোগাযোগ নেই আমার। আঠারো বছর পর, কয়েক মাস হলো, বড় বোনের সংগে টুকটাক কথা হয় মাঝে মধ্যে, টেলিফোনে। ওর কণ্ঠে মমতা ঝরে পড়ে। মুখে না বললেও ওর কথায় উচ্চারণে আমি এক ধরণের অনুশোচনা টের পাই। বোনের আদরবঞ্চিত ভাইটির জন্যে ওর হাহাকারও টের পাই। ওর নাগালের মধ্যে ছিলাম যখন, তখন এই মমতাটুকুর কাঙাল ছিলাম। এখন আর কী হবে ও দিয়ে!

এই এতো বছর পরেও যখন পেছন ফিরে তাকাই তখন দেখি–আমাকে অবজ্ঞা-অসম্মান-অপমান ও লাঞ্ছিত করা একটা ভাই গাঞ্জুটি। একটা ভাই ভুয়া ডাক্তার সেজে চেম্বারে রোগী দেখে। একটা ভাই বাবার প্রেসের সমস্ত টাকা মেরে দিয়ে স্বচ্ছলতা কেনে। বেকার একটা ভাই তার বউয়ের ছোটভাইয়ের দয়া ও আর্থিক আনুকূল্য নিয়ে বেঁচে থাকে। এবং ওদের একমাত্র শক্তি–বাবার সম্পত্তি। বিশেষ করে দৃশ্যমান আমাদের ওয়ারির বাড়িটা। যে সম্পত্তির অংশী ছিলাম আমিও। কিন্তু সেই সম্পত্তি থেকে নিজেকে আমি প্রত্যাহার করে নিয়েছি পঁচিশ বছর আগেই!

আমার নাম কিংবা আমার খ্যাতি-পরিচিতি ওদের আনন্দ দেয় না জানি। কিন্তু ওদের সন্তানেরা যখন পাঠ্যবইতে আমার লেখা পড়ে পড়ে পরের ক্লাশে উত্তীর্ণ হয় তখন আমার খুব আনন্দ হয়। ওরা জানে আমি ওদের কাকা হই, মামা হই। কিন্তু ওরা জানে না কাকা কেনো নেই, মামা কেনো নেই।

জীবনের এ এক আশ্চর্য ডিলেমা!
অটোয়া, ০২ মে ২০১৮

সূত্র : লুৎফর রহমান রিটন এর ফেসবুক ওয়াল থেকে। 

About the author

নরসুন্দা ডটকম