গদ্য সাহিত্য

পূজার ছড়া ছড়ার পূজা : লুৎফর রহমান রিটন

নরসুন্দা ডটকম   অক্টোবর ১৩, ২০১৮
Spread the love

আমার শৈশব কেটেছে ওয়ারিতে। আমাদের বাড়িটাই ছিলো হেয়ার স্ট্রিটের শেষ বাড়ি। আমাদের বাড়ির পরের বাড়ি থেকেই হিন্দু বাড়ি শুরু। উত্তর মৈশুন্ডি আর দক্ষিণ মৈশুন্ডি ছিলো বলতে গেলে হিন্দু পাড়া। হিন্দুরা বনগ্রামেও ছিলো কিছু। প্রচুর হিন্দু বন্ধু ছিলো আমার। সমবয়েসী সেই বন্ধুদের সঙ্গে কৈশোরে কতো আনন্দ করেছি পূজোর সময়। বিশেষ করে দুর্গা পূজোর সময়টায়। সন্ধ্যায়, উত্তর মৈশুন্ডির মন্দিরের সামনের রাস্তায় দুর্দান্ত ঢাকের অপূর্ব ছন্দের দুর্ধর্ষ রিদমের জাদুতে পাগলপারা অবস্থা হতো আমার।

আমার হিন্দু বন্ধুরা আমার হাতেও তুলে দিতো ধুপের ধোঁয়া ওঠা মাটির পাত্র, যেখানে থাকতো নারকেলের ছোবড়ার মধ্যে সুগন্ধি আগুন। শুরু হতো আরতী নৃত্য। (ধুঞ্চি নাচ বলে এটাকেই?) আমার বন্ধুরা, বন্ধুদের বোনেরাও শামিল হতো আমার সঙ্গে।

মিউনিসিপ্যালিটির লাইটপোস্টের আলোর সঙ্গে যুক্ত হওয়া মন্দিরের আলোকসজ্জা এবং সবকটা হিন্দুবাড়ির বাড়তি আলোর সম্মিলনে রাস্তাটা ভাসতো আলোর বন্যায়। সেই ঝলমলে আলোর মধ্যে ধুপের রহস্যময় ধোঁয়ার কুন্ডলির ভেতর আমি কতো যে নেচেছি ঢাকিদের ঢাকের প্রবল উস্কানিতে! বন্ধুদের মায়েরা মাসিরা দিদিরা আমার জন্যে তুলে রাখতেন পূজোর মিষ্টি, বিশেষ করে লাড্ডু। জীবনে বহু লাড্ডুই খেয়েছি দুনিয়ার বিভিন্ন মিষ্টির দোকানে। কিন্তু দুর্গা পূজোর সেই লাড্ডুর হলদে আভা আর স্বর্গীয় স্বাদের সঙ্গে আর কোনো লাড্ডুর তুলনাই চলে না।

দূর প্রবাসে এই সময়টায় আমি আমার শৈশবের দুর্গা পূজোর সেই ঢাকের বাদ্যি, ধুপের ধোঁয়া, আরতী নৃত্য, ছেলেবেলার হিন্দু বন্ধুদের, বন্ধুদের বোনেদের, মা মাসি আর দিদিদের সর্বোপরি হলুদ কিংবা হালকা কমলা আভা ছড়ানো দুর্গা পূজোর লাড্ডুগুলোকে খুবই মিস করি।

ঈদের ছড়ার পাশাপাশি কিছু পূজার ছড়াও লিখেছি আমি নানান সময়ে। আমার পাঠক বন্ধুদের জন্যে দু’টো এখানে তুলে ধরছি–

১. দুর্গা পূজার ছুটিতে

দুর্গা পূজার ছুটিতে— 
চতুর্দিকে খুশির হাওয়া
টেক্সাসে বা উটি-তে।

ছেলেমেয়ের জুটিতে
উড়ছে প্রজাপতির মতো
পূজার মজা লুটিতে।

গরিব ধনীর কুঠিতে
শারদীয় চাঁদের আলোয়
কুসুম হবেই ফুটিতে।

আয় আমরা দুটিতে—
ভালোবেসে যাই হারিয়ে
ছুটতে ছুটতে ছুটিতে…।

২. দুর্গা পূজার উৎসবে

ঢাক কুড়কুড় ঢাক কুড়কুড় ঢাকের শব্দ পাচ্ছি, 
দুর্গা পূজার উৎসবে তাই সবাই মিলে নাচছি।

পূজার প্রসাদ লাড্ডু মিঠাই যত্তো খুশি খাচ্ছি, 
মণ্ডপে মণ্ডপে সবাই দুর্গা দেখতে যাচ্ছি।

লক্ষ্মী সরস্বতী গণেশ মহিষাসুর সঙ্গী,
দশ হস্ত দুর্গা দেবীর কী লড়াকু ভঙ্গি!

মঙ্গলেরই বার্তা নিয়ে দুর্গা দেবীর যুদ্ধ,
অমঙ্গলকে হটিয়ে দিয়ে হোক ধরণী শুদ্ধ।

হিউস্টন ১১ অক্টোবর ২০১৮।।

[ দুর্গার প্রতিমূর্তিটি নির্মাণ করেছেন কলকাতার শিল্পী উৎপল ঘোষ। কেবলই মাটির প্রলেপ, এখনো রঙের ছোঁয়া লাগেনি। কিন্তু মাটির রঙেও অপূর্ব।]

নোট: বাংলাদেশের খ্যাতিমান ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন’র ফেসবুক পেজ থেকে নেয়া।

About the author

নরসুন্দা ডটকম