ঈদ সংখ্যা ২০২০

লাল পাসপোর্ট ।। গাজী মহিবুর রহমান

নরসুন্দা ডটকম   মে ১৭, ২০২০
লাল

ম্যানচেষ্টার এয়ারপোর্টের এরাইভাল লাউঞ্জে একজনকে রিসিভ করতে বাংলায় নাম লেখা একটি প্লেকার্ড হাতে অপেক্ষমান সাদমান। হঠাৎ একটি মেয়ে লাগেজ ভর্তি ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে তার সামনে এসে বললো ভাইয়া-

‘আপনি যার জন্য অপেক্ষা করছেন উনার বোধহয় আসতে একটু দেরি হবে। ইমিগ্রেশন অফিসার তাকে কি যেন জিজ্ঞাসাবাদ করছে।’

সে তো অবাক! এই মেয়ে জানলো কি করে, আমি কার জন্য অপেক্ষা করছি। সাদমান ভাবতে লাগলো….

-আচ্ছা, আপনি কী করে জানলেন আমি কারো জন্য অপেক্ষা করছি?
-আপনার প্লেকার্ডে যার নাম লেখা আছে তিনি এবং আমি পাশাপাশি সিটে বসে এসেছি। তাছাড়া তিনি আমাকে বলেছে কেউ একজন তার জন্য বাংলায় নাম লিখে দাঁড়িয়ে থাকবে।
-ওহ, আচ্ছা।

একটু অন্যমনস্ক হওয়ার চেষ্টা করে সাদমান। ভাবখানা এমন যেন মেয়েটির কথায় খুব একটা পাত্তা দেয়নি সে। তার দিক থেকে সন্তোষজনক সাড়া না পেয়ে মেয়েটি লাউঞ্জের ভেতরেই কয়েক চক্কর দিলো। একটু ঘুরে এসে আবার গায়ে পড়ে কথা বলার চেষ্টা করলো। সেবারও মেয়েটির সাথে আন্তরিকতা সুলভ আচরণ না করাতে সে অনেকটা মর্মাহত হলো। রিসিভ করতে আসা লোকজনের মধ্যে উপমহাদেশীয় চেহারার তেমন কেউ ছিল না। ফলে সে বারবার ঘুরে ফিরে তার সামনে এসেই দাঁড়াচ্ছিল। মেয়ে মানুষের প্রতি সহজাত দুর্বলতা থেকেই হোক আর মানবিক দিক বিবেচনায়ই হোক এবার সাদমান তাকে জিজ্ঞেস করে-

-আপনাকে রিসিভ করতে কেউ আসেনি ?

-একজন আসার কথা। কিন্তু আমি তার চেহারা চিনি না। আমার কাছে তার নম্বর আছে। আপনি কি এই নম্বরটিতে একটা ফোন দিতে পারবেন, প্লিজ। কথাগুলো বলতে বলতে মেয়েটি নম্বর লিখা একটি কাগজ তার পার্স থেকে বের করে দেয়।

নম্বরটি সাদমানের মোবাইলে চেপে ডায়াল দিতেই স্ক্রিনে একটি নাম ভেসে উঠলো। সেই ভদ্রলোককে সে ভাল করেই চিনে এবং বলতে গেলে ভালোই সম্পর্ক। ইংল্যান্ডের ওল্ডহাম শহর থেকে প্রকাশিত একটি বাংলা পত্রিকায় সাংবাদিকতা করার কারণে ম্যানচেষ্টারস্থ বাংলাদেশের সরকারি অফিস গুলোতে ভালোই আনাগোনা তার। যে কারণে ওইসব অফিসের প্রয়োজনীয় সবার নাম্বারই তার মোবাইলে সংরক্ষণ করা। ফোনের ওপাশ থেকে ভদ্রলোক ফোন ধরেই বলে উঠলেন-

-কী মনে করে এই অধমকে স্মরণ করলেন, ভাই।
-প্রয়োজন ছাড়া কী আর আপনাদের মতো অফিসিয়ালসদের ডিস্টার্ব করা উচিত ?
এমন উত্তরে ভদ্রলোক খুব নরম সুরে বললেন- কী যে বলেন ভাই..
তার কথা শেষ করার আগেই সাদমান বলে-
-শোনেন, আজকে অবশ্য রিপোর্ট সংক্রান্ত কিংবা আমার ব্যক্তিগত কোন কাজে ফোন করিনি।
-তাহলে ?

মেয়েটি তন্ময় হয়ে তাদের ফোনালাপ শুনছিলো। ওর চেহারায় এক ধরনের প্রশান্তির ছাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। ফোনালাপ শুনে নিশ্চয়ই এতক্ষণে মেয়েটি বুঝে গেছে যেই ভদ্রলোকের উপর নির্ভরশীল হয়ে সে এখানে এসেছে ওই ভদ্রলোক তার খুব কাছের কেউ। মোবাইলটি মেয়েটির উদ্দেশ্যে বাড়িয়ে দিতে দিতে- নেন, যেই জন্যে ফোন দেওয়া কথা বললেই বুঝতে পারবেন।- বলে সাদমান।

দীর্ঘ বিমান জার্নি করে এক অজানা অচেনা কনকনে ঠান্ডার এই হিমশীতল দেশে কেবলই আগমন করা মেয়েটি ফোন ধরেই কাঁপা কাঁপা গলায় বললো-
-শাকিল ভাইয়া, আমি তানজিনা। বাংলাদেশ থেকে মাত্রই এসে পৌঁছেছি। ওই যে, তপু সেদিন আপনাকে ফোন করেছিল, হ্যাঁ, আমার জন্যই ফোন করেছিল।

ফোনের ওপাশ থেকে শাকিল সাহেব কি বলেছে কে জানে, মুহুর্তেই মেয়েটির চেহারা মলিন হয়ে গেল। দেখে মনে হচ্ছে মেয়েটার চোখে মুখে এক ধরনের অজানা ভয় কাজ করছে। করাটাও খুব স্বাভাবিক। জানা নেই চেনা নেই এমন কি কোন আত্মীয় স্বজনও নেই। আবার কেউ রিসিভ করতেও আসেনি।
একজন মানুষ জীবনের প্রথম ইংল্যান্ডের মতো একটি দেশে আসলে যে ধরনের উচ্ছ্বাস তার মধ্যে পরিলক্ষিত হওয়ার কথা সেই রকম কোন কিছু ওর মধ্যে লক্ষ্য করা গেল না। কথা শেষ না করেই মোবাইলটি বাড়িয়ে দিয়ে বললো- শাকিল ভাইয়া আপনার সাথে কথা বলবে। সে মোবাইল কানে নিয়ে হ্যাঁ বলতেই ওপাশ থেকে শাকিল সাহেব খুব বিনয়ের সুরে বললো-

-ভাই, যদি কিছু মনে না করেন মেয়েটাকে যদি আপনার সাথে নিয়ে আসতেন। আর সুরুজ ভাইয়ের বাসায় একটু পৌঁছে দিতেন প্লিজ।
সাদমানকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সে বলেই যাচ্ছিল-
-আসলে ভাই আমারই আসার কথা ছিল কিন্তু অফিস থেকে ছুটি পাইনি। যদি দয়া করে একটু ফেভার দেন।

শাকিল সাহেবের এমন অনুরোধে কি উত্তর দিবে বুঝতে পারছিলাম না সাদমান। বারবার তার মাথায় একটা জিনিস কাজ করছিল বেচারা বিমান বাংলাদেশ এর ম্যানচেষ্টার অফিসে চাকুরী করে। বিভিন্ন সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ নিউজের খুটিনাটি তথ্য দিয়ে সহায়তা করে থাকে। এমন একজন মানুষের অনুরোধ এড়ানো বোধহয় ঠিক হবে না। অনেক ভেবে চিন্তে তাকে বলে-

আরে ভাই কি যে বলেন, আপনি একটা কথা বললে কি আর না করতে পারি। তাছাড়া সুরুজ ভাইয়ের বাসা যেহেতু আমার বাসার কাছাকাছি। আচ্ছা ঠিক আছে। তবে হ্যাঁ, আমি যাকে রিসিভ করতে এয়ারপোর্টে এসেছি তিনি যতক্ষণ না বের হচ্ছেন এমনকি তাকে নিউক্যাসেলের ট্রেনে উঠিয়ে দেওয়ার আগে আমি যেতে পারবনা।- বলে সাদমান।

এরই মধ্যে মেয়েটি বললো-কোন সমস্যা নেই আমি ততক্ষন ওয়েটিং লাউঞ্জে অপেক্ষা করবো।

মেয়েটির অবস্থা দেখে সাদমানের বারবার মনে পড়ছিল দুই বছর আগে যখন প্রথমবারের মতো সে ইংল্যান্ডে এসেছিল, এই ম্যানচেষ্টার শহরে সেদিন তার পরিচিত, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন কেউ ছিলনা। এমনকি কোথায়, কার বাসায় উঠবে তারও কোন নিশ্চয়তা ছিলনা। কিন্তু ঘটনাচক্রে সেদিন তার এক বান্ধবীর বয়ফ্রেন্ডের বন্ধুর বাসায় উঠেছিল সে। যাদের আতিথেয়তা মানুষ সম্পর্কে নতুন ধারণা দিয়েছে সাদমানকে। একজন অপরিচিত মানুষকেও যে এতোটা আপন করে নেওয়া যায় তাও আবার বিলেতের মতো এমন যান্ত্রিক জীবনযাত্রার দেশে সত্যিই অবিশ্বাস্য। তাদের কাছে সে আমৃত্যু কৃতজ্ঞ থাকবে। এসব ভাবনার মধ্যেই মেয়েটি হঠাৎ বলে উঠলো- “ভাইয়া, এই যে তিনি চলে এসেছেন, যার জন্য আপনি অপেক্ষা করছেন।”

সেই ভদ্রলোকের সাথে কুশলাদি বিনিময়ের পর তাকে নিউক্যাসলের ট্রেনে উঠিয়ে দিতে যায় সে। ঢাকা থেকে আসা এই ভদ্রলোক সাদমানের খুব কাছের বন্ধু পাশার কাজিন। পাশা ইংল্যান্ডের নিউক্যাসল শহরে থাকে। ম্যানচেষ্টার থেকে নিউক্যাসেল মোটামুটি বেশ দুরের পথ। ছুটি না থাকায় পাশা আসতে পারেনি ফলে দায়িত্ব পড়েছে সাদমানের উপর আর যেহেতু সে ম্যানচেষ্টারে থাকে। গত এক বছরে একাধিকবার এই এয়ারপোর্টে অনেককে রিসিভ করতে এসেছে সাদমান। যদিও এদের মধ্যে তার আত্মীয় স্বজন কেউ ছিল না। এরকমই কোন বন্ধুর আত্মীয় কিংবা পরিচিতজন। কেন জানি এয়ারপোর্টে আসতে তার খুব ভালো লাগে। এখানে আসলে বিশেষ করে সাড়ি সাড়ি বিমান দেখলেই- তার মনে দোলা দিয়ে যায়- আহ! বিমানে চড়ে বসলেই প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ। ফলে এখানে আসলেই সে মনে করে যেন দেশমাতৃকার ঘ্রাণ পাচ্ছে। বিদেশে যারা থাকে তাদের কাছে দেশ সত্যিই মায়ের মতো। দেশে থেকে এতটা অনুভব করা যায় না।

মেয়েটিকে নিয়ে রওনা দিতে উদ্যত হয় সাদমান। এরই মধ্যে জানা হলো মেয়েটির নাম তানজিনা

-আপনি কি বাসে যাবেন নাকি ট্যাক্সিতে ? তানজিনাকে সাদমান জিজ্ঞেস করে।

– ভাইয়া, আপনি যেটা ভাল মনে করেন।

সাদমানের উপর দায়িত্ব অর্পিত হওয়ায় সে ভাবছিল ট্যাক্সিতে গেলে কম করে হলেও বিশ পাউন্ড ভাড়া আসবে। আর যেহেত তার বাস টিকেট করাই আছে কাজেই ওর জন্য সাড়ে তিন পাউন্ড দিয়ে একটা টিকেট করলেই হয়ে যাবে। তার মাথায় এটা ভালো করেই ছিল যারা দেশ থেকে আসে তারা খুবই সীমিত টাকা নিয়েই আসে। কাজেই একটু হিসেবি হলে বোধ হয় ভবিষ্যতের জন্য ভালো বৈ খারাপ হবে না। হয়তো সময় একটু বেশী লাগবে কিন্তু টাকাটা সাশ্রয় হবে।

বাসে উঠে বসতেই তানজিনা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। জানতে চাইলো বাসায় যেতে কতক্ষণ লাগবে। দেড় ঘন্টা লাগবে বলতেই তার কপালে ভাঁজ তুলে বললো আরো দেড় ঘন্টা লাগবে! ঢাকা থেকে আবুধাবি হয়ে ম্যানচেষ্টার এই লম্বা জার্নিতে ওর চেহারায় ক্লান্তির ছাপ ফুটে উঠছিল। মনে হচ্ছিল বাসের সিটটাকে বাংলাদেশের বাসের মতো হেলান দেওয়া যেত তাহলে এক্ষনি সে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যেত। ম্যানচেষ্টার এয়ারপোর্ট থেকে সিটি সেন্টার, তারপর বাস পরিবর্তন করে আরেকটি বাস ধরে গন্তব্যে যেতে হবে।

এয়ারপোর্ট থেকে আঁকাবাঁকা পথ মাড়িয়ে বাস এগিয়ে চলেছে সিটি সেন্টারের দিকে। এরই মধ্যে আলাপচারিতায় সাদমান জানতে পারলো তানজিনা ঢাকার একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ শেষ করে এমবিএ ভর্তির আগেই ম্যানচেষ্টারে একটি কলেজে পড়তে এসেছে। মেয়েটির বাড়ি ফরিদপুর। বাবা-মা’র একমাত্র মেয়ে। ম্যারিড নাকি আনম্যারিড এমন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে সে অনেকটা চুপসে যায়। কি বলবে বুঝে উঠতে পারছিল না। আমতা আমতা করে বললো বিদেশ আসার দুইদিন আগে কাউকে না জানিয়ে তার সহপাঠী, বয়ফ্রেন্ড একটি ছেলেকে বিয়ে করে এসেছে। এমনকি তার বাবা-মা পর্যন্ত ব্যাপারটি জানে না। আলাপচারিতায় সে নি:সংকোচচিত্রে এটাও বলে ছেলেটির সাথে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। বলতে গেলে অনেকটা হাজবেন্ড-ওয়াইফের মতোই। এসব কথা শোনে একটু হতচকিত হয় সাদমান। আর ভাবে এ যুগের ছেলেমেয়েদের মুখে কোন কিছু আটকায় না।

-এখানে কি পড়তে এসেছো ? সাদমান জানতে চাইলে সরল স্বীকারোক্তির ভঙ্গিতে বলে-
-পড়াশুনা আর কি যদি এদেশে থেকে যেতে পারি। যেকোনোভাবে যদি এখানে স্যাটেল হয়ে যেতে পারি। আর শুনেছি দীর্ঘদিন ইউরোপে থাকলে শেষমেষ একটা লাল পাসপোর্টের ব্যবস্থা নাকি হয়েই যায়।

ওর কথাগুলো তার কাছে মিরপুরের স্পোর্টিং উইকেটে হঠাৎ কোন অনাকাঙ্খিত বাউন্সারের মতো মনে হচ্ছিল। একটু আগেও যে মেয়েটিকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল নৌকা ডুবিতে পরে ভাসান পানিতে সাঁতার না জানা কোন শহুরে মেমসাহেব, এই বুঝি প্রাণ যায় যায়। অথচ এখন ওর কথা শুনে মনে হচ্ছে এ তো দেখি জাতি সাপের বাচ্চা।

ফিরোজ মিয়ার বাসায় মেয়েটিকে নামিয়ে দিয়ে সাদমান তার বাসার উদ্দেশ্যে হাঁটছে। আর ভাবছে মেয়েটি যে রঙিন স্বপ্ন নিয়ে আইনকানুন আর ছকে বাঁধা জীবনের এই বরফাচ্ছন্ন দেশে এসেছে সে কি শেষ পর্যন্ত স্বপ্নের কাছাকাছি যেতে পারবে ? এইদেশে অনেকেই অবৈধভাবে এসে বৃটিশ পাসপোর্ট তথা লাল পাসপোর্ট হোল্ডার হয়েছেন। এ কথা সত্য। কিন্তু এগুলো এখন কেবলই ইতিহাস। এই বায়োমেট্রিক যুগে এসে এখন আর রহিমকে করিম বানানো যেমন সম্ভব না তেমনি খালাত বোন, তালাত বোন কিংবা কাগুজে বিয়ে করে বৃটিশ নাগরিক হওয়ার দিনও শেষ হয়ে গেছে। অরিজিনাল বৃটিশরাই এখন সামনে অন্ধকার দেখছে। তবে হ্যাঁ এটাও সত্য যে, অনেকেই শূন্য হাতে বৃটেনে এসে নিজ দেশে আলিশান বাড়ি করেছেন যা দেখে দেশের মানুষ মনে করে বৃটেনে টাকার গাছ আছে। আর সেই গাছে ঝাঁকি দিলে বড়ই গাছের মতো ঝাঁকে ঝাঁকে পাউন্ড পড়ে।

তানজিনার মতো এরকম হাজারো মেয়েছেলে এমন স্বপ্ন নিয়ে অতি সম্প্রতি বিলেতে এসেছে। কারো স্বপ্ন হয়তো বাস্তবে রুপ নিবে। আবার কারো স্বপ্ন হয়তো থেকে যাবে অধরা। আর এমনও দেখা যায় স্বপ্নহীন, গন্তব্যহীন কিংবা কিছু বুঝে না বুঝে কচুরিপানার মতো স্রােতের টানে ভাসতে ভাসতে অনেকে চলে এসেছে বিলেতে। সাদমানের মনে পড়ে গেল বন্ধু সাহেদের কথা। দেশে পড়াশুনায় খুব একটা ভাল ছিলনা। এখানে স্টুডেন্ট ভিসায় আসলেও আজ পর্যন্ত কলেজে যায়নি। স্যাটেল হওয়ার ধান্ধায় সারাক্ষণ ফাঁক ফোকর খোঁজে ফিরে। ম্যানচেষ্টারে এসে সাদমানের যাদের সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে সাহেদ তাদেরই একজন। সাদমান-সাহেদ দু’জনেই বৃহত্তর ময়মনসিংহের ছেলে বলে এলাকার মানুষ হিসেবে সম্পর্কটার মধ্যেও এক ধরনের আঞ্চলিকতা এবং আন্তরিকতা ছিল পারস্পারিক।

সাহেদের সাথে যেদিন থেকে পরিচয় হয়েছে সেদিন থেকেই সাদমান দেখেছে সে প্রচুর ড্রিংক করে। অবশ্য সাহেদ যেই বাসায় থাকে সেখানকার সবাই ওর চেয়ে বেশী বৈ কম করেনা। সাহেদ একটি মোবাইল ফোন কোম্পানীর স্ট্রিট সেলসম্যান হিসেবে কাজ করে। প্রতিদিনই ভিন্ন ভিন্ন জনাকীর্ণ এলাকায় সিমকার্ড বিক্রি করে। ফলে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার এমনকি বিভিন্ন ধর্মের ও বর্ণের মানুষের সাথে মেশা ও কথা বলার সুযোগ তার হতো। সুযোগ সন্ধানী সাহেদ সুযোগের অপেক্ষায় প্রহর গুনতো। যদি কোন শিকার ওর চৌহদ্দির মধ্যে আসে তা নিজের বানিয়ে নিতে ভুল করার পাত্র সে নয়। কিছুদিন পরে সাদমান শুনতে পেল সাহেদ সাদা চামড়ার একটি মেয়েকে বিয়ে করেছে। এ নিয়ে তাদের বন্ধু মহলে এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেল। কেউ বলছিল শালা কামের কাম করছে। কেউ বলছিল ও এইটা কি বিয়ে করছে, মেয়ের বয়স তো ওর চেয়ে বেশী হবে। এ নিয়ে নানান রসালো কথা।

মেয়েটি শারিরীকভাবেও সাহেদের চেয়ে বড়সর। বাঙালী কমিউনিটির একটু বয়স্ক লোকজন অবশ্য সাহেদকে বাহবা দিচ্ছিল। তারা বলছিল, বেডা ইংরেজের পুরিরে মুসলমান বানাইছইন। মেয়েটির নাম ছিল জেমা। তাকে ধর্মান্তরিত করে নতুন নাম দেওয়া হয়েছে আয়েশা। ভালোই চলছিল সাহেদ-আয়েশার সংসার। মাঝে মধ্যে বন্ধুরা সাহেদের বাসায় গেলে আয়েশা ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় বলার চেষ্টা করতো কে..ম..ন আছেন ? তখন সবার মনে পড়ে যেত ভারতবর্ষে বৃটিশ শাসনামল নিয়ে নির্মিত কোন সিনেমার ডাইলগে ক্লাইভ লয়েড কিভাবে বাংলায় সংলাপ বলতেন।

এরই মধ্যে এক বন্ধের দিন সাদমানসহ বেশ কয়েকজন বন্ধু ডিকেনসন রোডের পাশে অবস্থিত ওপেন মার্কেটের একটি কোণায় দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছিল। সেই আড্ডায় যোগ দিয়েছিল তাদের বন্ধু মামুনও। একসময় সাদমান-মামুন এক সাথেই থাকতো কিন্তু চাকরীর কারণে মামুন এখন পাশের শহরে থাকে। বন্ধের দিন সবার সাথে আড্ডা দিতে চলে আসে। সবাই যখন আড্ডায় মগ্ন মামুন তখন অন্যমনস্ক হয়ে এক ধ্যানে কি যেন দেখছে।

-এই মামুন কী এমন হা করে দেখছিস ? সাদমান জিজ্ঞেস করে।
-সাহেদের সাথে এই মেয়েটা কে রে? প্রশ্নের উত্তরে মামুন পাল্টা প্রশ্ন করে।
সাহেদ বিয়ে করছে তুই জানিস না? শালায় তো সাদা চামড়ার এই মালটারেই বিয়ে করছে। -একজন বলল।

এই কথা শোনার পর মামুন নির্বাক হয়ে পুলিশি দৃষ্টিতে সাহেদের বউকে এমনভাবে দেখছে আর কি যেন ভাবছে। মামুনকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে ওর গায়ে ধাক্কা দিয়ে কিছু বলার আগেই সে বলে উঠে-
-সাহেদ এই মেয়েকে বিয়ে করছে ? বিশ্বাস হচ্ছে না। এটা হতে পারে না।
-কেন হতে পারে না ? তোর সমস্যা কী ? একজন আবারো বললো।

মামুন প্রলাপ করার মতো করে সাহেদের বউ সম্পর্কে একের পর এক নানান রসালো কথাবার্তা বলেই যাচ্ছে। এক পর্যায়ে ওর নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতেও পিছপা হয়নি মামুন। বলেই চলে লেভেনজুমে একদিন এই মেয়েটির সাথেই রাত কাটিয়েছিলাম। মেয়েটি কলেও যায় আমি জানি। মেয়েটির অরিজিন হচ্ছে আইরিশ। সব শোনার পরে বন্ধুরা সবাই অবাক হয়েছিল। এমনকি মামুন যখন বললো সাহেদ মামুনের সাথেই প্রথম এই মেয়েটির সাথে ইয়ে করতে গিয়েছিল। পরে সাহেদ প্রায়ই মেয়েটির কাছে একই কাজে যেত বলে মামুনের কাছে বলতো। তাদের আড্ডা ততক্ষনে মোড় নিয়েছে সাহেদ কেন এমন বিয়ে করলো এই গবেষণার দিকে।

সবার একটাই প্রশ্ন জেনেশুনে সাহেদ কেন এমন কাজ করলো ? সাহেদ বউসমেত তাদের পাশ দিয়ে চলে গেল কেউ তাদের ডাক দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলো না। সাহেদ হয়তো মামুনকে দেখে আসতে চায়নি। আড্ডার যবনিকাপাত ঘটার আগে একজন বলে উঠলো শালা লাল পাসপোর্টের ধান্ধায় ঘুরতে ঘুরতে লাল বউ পাইয়া গেছে। এখন তো লাল বউয়ের সাথে লাল পাসপোর্ট ফ্রি পেয়ে যাবে।

এরই মধ্যে নদীর জল অনেক গড়িয়েছে। ঘড়ির কাঁটা ঘুরেছে আপন গতিতে। বিলেতের হিমশীতল ঠান্ডা কেটে গিয়ে চলছে সামার তথা বিলেতের গ্রীস্মকাল। যদিও বাংলাদেশে হলে এটাকে কনকনে ঠাণ্ডা তথা শীতকালই বলতো সবাই। কিন্তু এমন গ্রীস্মকাল উপভোগ করতে বৃটিশদের মধ্যে উন্মাদনা আর আয়োজনের কমতি থাকে না। ব্ল্যাকপুলের সী বিচ বিকিনি পড়া যুবতী আর অন্তর্বাস পড়া যুবকদের পদচারণায় মূখর হয়ে উঠে। ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট মালিকদের তখন মাথায় হাত দেওয়া ছাড়া যে কাজটি অবশিষ্ট থাকে তাহলো কর্মী ছাঁটাই।

যারা রেষ্টুরেন্টে কাজ করে তাদের অনেকের কপাল পুড়ে বিলেতি গ্রীস্মের খরতাপে। শাকিল আর তানজিনার অনেক অনুরোধে আসার এক সপ্তাহের মধ্যেই একটি ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টের বার সেকশনে তাকে কাজের ব্যবস্থা করে দেয় সাদমান। যেই রেস্টুরেন্টে ম্যানেজার ছিল সাদমানের বন্ধু রুমান। মূলত তাকে ধরেই এই কাজের ব্যবস্থা করে দেয় সে। রুমনের মাধ্যমে পরবর্তীতে সাদমান জানতে পারে মদের বারে কাজ করতে করতে মেয়েটি চায়ের মতো মদ পান করে। শুনে নিজেকে অপরাধী ভাবতে শুরু করে সাদমান। আবার সে নিজে নিজে এটাও ভাবছিল কই আমিও তো মদের বারে কাজ করি এমনকি রোজা রেখেও কাষ্টমারদের মদ সার্ভ করি কোনদিন তো মদ পান করিনি। সে আরো অবাক হলো যখন সে শুনতে পেল মেয়েটি মদ খেয়ে মাঝে মাঝে রেষ্টুরেন্ট মালিকের সাথে উপর তলায় বিশ্রাম কক্ষেও যায়। ছয় মাস যেতে না যেতেই মেয়েটির এই অবস্থা দেখে শাকিল সাহেবকে বিস্তারিত বলার প্রয়োজন বোধ করলো সাদমান। ঘটনা শুনে শাকিল সাহেব বললো-

-ভাই ঘটনা তো এখানেই শেষ না। আপনি বরং আমার কাছ থেকে আরো লেটেষ্ট কিছু শোনেন। মেয়েটি একটি ছেলের সাথে অবৈধভাবে লরিতে করে ফ্রান্স যাওয়ার জন্য ইতোমধ্যেই কন্ট্রাক করে ফেলেছে। যেকোন দিন চলে যাবে। শুধু তাই নয় ছেলেটির সাথে নাকি এগ্রিম্যান্ট করেছে ফ্রান্সে যেতে পারলে দুইজনে স্বামী-স্ত্রী সেজে এ্যাসাইলাম করবে। ফ্রান্সে নাকি সিঙ্গেল এর চেয়ে কাপল এ্যাসাইলাম বেশী গ্রহনযোগ্য।
বলেন কী ? সাদমান বলে।

এমন প্রশ্নে শাকিল সাহেব বলেন-
-ভাই দেশে তপু নামের যে ছেলের সাথে বিয়ের সূত্র ধরে আমার এই মেয়ের সাথে পরিচয় সেই ছেলের সাথে ইতোমধ্যেই সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছে। তিনি আরো বললেন-
-তপু দেশ থেকে আমাকে ফোন করে ওর বিস্তারিত জানাতে বলেছিল। মেয়েটির সাথে আমি কথা বলেছিলাম ওর নাকি যে কোন উপায়ে লাল পাসপোর্ট লাগবে। আর বিলেতে সেই সুযোগ অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে এসেছে। এটা বুঝতে পেরেই সে উন্মাদ।

সপ্তাহখানেক পরে বিলেতের একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ছবিসহ একটি সংবাদ দেখে চোখ আটকে গেল সাদমানের। আরে, এটা তো তানজিনার ছবি। সংবাদটি পড়ে সে জানতে পারল অবৈধভাবে লরিতে করে ফ্রান্স ঢোকার পথে সাতজনকে আটক করেছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। যাদের মধ্যে তানজিনাসহ আরেকজন বাঙালী যুবক রয়েছে।

গাজী মহিবুর রহমান : লেখক, কলামিস্ট।

আরও পড়তে পারেন…

কাঁদছে মানুষ, হাঁসছে প্রকৃতি ।। ফয়সাল আহমেদ

About the author

নরসুন্দা ডটকম