গদ্য সাহিত্য

জুজখোলার খোলা জানালা ।। রমেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য

নরসুন্দা ডটকম   May 30, 2020
জানালা

কোনো এক সুন্দর সকালে আমার বৈবাহিক মশায় (কন্যার শ্বশুর) আমার বাড়ি এসে অযাচিতভাবেই আমাদের বাংলাদেশ ভ্রমণের প্রস্তাব দিলেন। বাংলাদেশর পিরোজপুর জেলার জুজখোলা গ্রামে তাঁর পৈতৃক ভিটে ও সম্পত্তি এখনো বর্তমান এটা জানা ছিল। বৈবাহিক মশায়ের ছোট ভাইটি জন্ম থেকেই বাংলাদেশ নিবাসী।

দেশ ভাগের সময় আমার বৈবাহিকের মতো এপার বাংলায় এসে থিতু হননি। আমার কনিষ্ঠ বৈবাহিক কর্মসূত্রে ঢাকা নিবাসী হলেও জুজখোলা গ্রামের পৈতৃক জমি বাড়ির তিনি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকেন । বড় ও ছোট দুই ভাইয়ের মাঝে মাঝেই সপরিবারে এপার ওপার যাতায়াত আছে। ছোট ভাই চিত্তপ্রসাদ একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট এবং ঢাকায় তাঁর নিজস্ব ফার্ম রয়েছে। বনানীর একটি অভিজাত আবাসনে তাঁর সপরিবারে বাস। আমার বেয়াই মশায় সত্যপ্রসাদ তাঁর পূর্বপুরুষের দেশে ভ্রমণের প্রস্তাব দেওয়ার পর চিত্তপ্রসাদ একদিন আমাকে ফোনে জানালেন, তাঁদের গ্রামের পৈতৃক জমিতে তিনি সম্প্রতি একটি অত্যাধুনিক রিসর্ট নির্মাণ করেছেন। এ ছাড়াও তিনি ওই জমিতে একটি মনসাদেবীর মন্দির নির্মাণ করেছেন । এই রিসর্ট উদ্বোধন এবং মন্দির প্রতিষ্ঠা উৎসবে তিনি আমাদের সপরিবার উপস্থিতি ও আতিথ্য গ্রহণ একান্তভাবে কামনা করেন। বার বার সনির্বন্ধ অনুরোধ জানালেন আমরা যেন তাঁর আমন্ত্রণ সাদরে গ্রহণ করি।

 আমি ও আমার গিন্নির আগে থেকেই পাসপোর্ট করা ছিল। তাই এমন অভাবনীয় আমন্ত্রণে পিছু হটবার কোনো ইচ্ছে ছিল না। তাছাড়া যখন আমার মেয়ে, জামাই, মেয়ের শ্বশুর, শাশুড়ি ও এপার বাংলায় বসবাসকারী তাদের আরো অনেক আত্মীয় স্বজন এই উৎসবে যোগ দিতে বাংলাদেশে যাবার জন্য প্রস্তুত। আমরা কর্তা-গিন্নি নির্দিষ্ট দিনে বনগাঁয় পেট্রাপোল সীমান্তে এসে হাজির হলাম। ততক্ষণে আমার মেয়ে, জামাই, বেয়াই, বেয়ান ও তাদের অন্যান্য আত্মীয় স্বজন ভারতীয় অভিবাসন দপ্তরের সামনে এসে হাজির হয়েছে। আমি কারেন্সি এক্সচেঞ্জ কাউন্টার থেকে কিছু ভারতীয় টাকা বাংলাদেশি মুদ্রায় ভাঙিয়ে নিলাম। ভারতের ইমিগ্রেশন অফিসের কাজ মোটামুটি নির্বিঘ্নে মিটে গেল। এবার সীমান্ত পেরিয়ে সবাই মিলে লাইন দিলাম বেনাপোলে বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন অফিসে।

কয়েকদিন আগে আমি কলকাতায় বাংলাদেশ হাইকমিশন অফিস থেকে ভিসা সংগ্রহ করে এসেছি। কাউন্টারে পৌঁছতে ইমিগ্রেশন অফিসার আমার ভিসা পাসপোর্ট পরীক্ষা করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন আমি কী করি এবং কেন বাংলাদেশে যাচ্ছি।

উত্তর দিলাম, ‘আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মী। তবে বর্তমানে  একটি জেলার সংবাদপত্রে সাংবাদিকতা করি এবং বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লেখালেখি করি। বাংলাদেশে এক আত্মীয়ের বাড়ি উৎসবে যোগ দিতে যাচ্ছি’।

আমার গলায় ঝোলানো ছিল আমার পত্রিকার প্রেসকার্ড। সেটা তুলে ধরে দেখাতে অফিসার বললেন,

‘ দেখবেন ফিরে গিয়ে আপনাদের পত্রিকায় আমাদের দেশ সম্বন্ধে কিছু খারাপ মন্তব্য করবেন না যেন’।

আমি হেসে বললাম, ‘ কী যে বলেন ! বাংলাদেশ আমার বাবা মায়ের জন্মভূমি। আপনাদের দেশের সঙ্গে আমার রক্তের টান রয়েছে যে’। অফিসারটি আমার কথায় খুব খুশি হলেন। আমার কাগজপত্র অনুমোদন করে জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে আমার সঙ্গে হেসে করমর্দন করে বললেন, ‘ বাংলাদেশ আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছে’। ওদিকে মহিলা কাউন্টার থেকে আমার স্ত্রীরও সব কাজ মিটে গেল। আমরা গেট দিয়ে বেরিয়ে যাবার সময় একজন পুলিশ আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ আপনেগো ব্যাগে কী আছে খুইল্যা  দেখান’। আমি একটা ব্যাগের চেন খুলে বললাম, ‘ কী আর থাকবে, জামা কাপড়, বই খাতা জলের বোতল…আর এই একটা ছোট্ট ক্যামেরা’। আমার সঙ্গে ক্যাননের একটা পাওয়ার শট ক্যামেরা ছিল। আর ভিডিও ক্যামেরাটা ছিল গিন্নির ব্যাগে মেয়েদের অন্তর্বাস জড়ানো। পুলিশ বাবাজি আমার ক্যানন ক্যামেরাটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ এইডা কি ডিজিটল ক্যামেরা ?’ আমার ঝটিতি জবাব, ‘ না না এটা একটা পাতি ক্যামেরা। আমার এক বন্ধুর থেকে চেয়ে এনেছি। ঠিকমতো চালাতেও জানি না’। মধ্যবয়সি কনিষ্ঠগোপাল বাবুটি আমার ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরখ করে রায় দিল, ‘ হঃ এইডা ডিজিটল না। আলায় হস্তার ক্যামেরা। এইয়ার লাইগা আলেদা পারমিশান লাগত না। আহেন  আপনেরা আহেন’। আমি গিন্নিকে নিয়ে গেটের বাইরে বেরিয়ে এসে মনে মনে বললাম, ‘ তুমি ক্যামেরার ঘোড়ার ডিম বোঝো হে পুলুশ বাবা’।

বাংলাদেশ ভূখণ্ডের পথে নেমে দেখি আমার ছোট বেয়াই চিত্তপ্রসাদের বড় ছেলে শ্যামল হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের জুজখোলা গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাবার জন্য। সঙ্গে রয়েছে ড্রাইভার সহ চারটি বড় সাইজের গাড়ি। আমরা সবাই চারটি গাড়িতে ভাগাভাগি করে উঠে পড়লাম। গাড়ি এগিয়ে চলল যশোর-খুলনা হাইওয়ে ধরে। পথের দু’পাশে সারিবদ্ধ দোকানপাট এবং গাছপালা আমাদের এপার বাংলার মতোই। শুধু একটা পরিবর্তন, দোকানের সব সাইনবোর্ড বাংলায় লেখা। যদিও ব্যাপারটা আগে থেকে জানা ছিল তবুও চাক্ষুষ দেখে বেশ ভালো লাগল।

বৈশাখ মাস। বেলা প্রায় দুপুর। খানিকটা যাবার পর মাঝারি ধরনের একটা হোটেলে মধ্যাহ্নভোজন সেরে নেওয়া হল। তারপর আবার গাড়ির টায়ারে কিলোমিটার গুটোতে শুরু করল। হাইওয়ের পথে ফুলতলা বাস স্ট্যান্ডে দেখলাম একটা সাইনবোর্ডে বাংলায় লেখা রয়েছে—-এই স্থান হইতে ৩ কি.মি দূরে দক্ষিণডিহি গ্রামে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ি। ক্রমশ রাস্তার দু’পাশের চেহারা বদলে যাচ্ছে। কখনো গাড়ি চলেছে গঞ্জ, শহর, গ্রাম্য লোকালয়ের ভেতর দিয়ে। কখনো আবার রাস্তার দু’ধারে সবুজ ধানখেত, সবজিখেত, দূরে দূরে খড়ের ছাউনি দেওয়া চাষিদের ঘর সংসার। পিরোজপুর বাজার থেকে জুজখোলা যাবার রাস্তাটা একেবারে নাক বরাবর সিধা। বেশ চওড়া ও মসৃণ রাস্তা। কোথাও খানা খন্দ নেই। ভাবছি গ্রামের রাস্তা যদি এমন চকচকে হয়, শহরের রাস্তা না জানি কী রকম। পরে বুঝেছিলাম বাংলাদেশ সড়ক উন্নয়নে আমাদের দেশের থেকে অনেক এগিয়ে গেছে

যখন জুজখোলা গ্রামে বেয়াই মশায়ের পৈতৃক ভিটায় এসে পৌঁছলাম তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে। আমার ছোট বেয়াই চিত্তপ্রসাদ বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে আমাদের সবাইকে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। বাড়ির ভেতরে ঢুকে দেখি এলাহি ব্যাপার। গোটা বাড়িটার ভেতর এবং বাইরের দিক বিজলী বাতির বন্যায় ভাসছে। আধুনিক কায়দায় তৈরি প্রাসাদের মতো দোতলা বাড়িটার উঠোনের সিঁড়ি থেকে শুরু করে সমস্ত মেঝে সাদা মার্বেল পাথরে তৈরি। সব কটি ঘরে বাহারি খাটে নরম গদির বিছানা। সঙ্গে মানানসই ফার্নিচার। সিগনেচার ওয়ালে চোখ জুড়নো ল্যাম্পশেড। উল্টোদিকের দেওয়ালে স্প্লিট এ.সি। বাথরুমে মার্বেল পাথরের বিশাল বাথটব সহ গীজার ও স্যানিটারি সেটিংস। বাড়িটার পিছন দিকে মার্বেলপাথরে বাঁধানো ঘাট সহ একটি সুইমিংপুল। বাড়ির মাঝখানে বিশাল উঠোন। উঠোন ঘিরে তৈরি হয়েছে পুজো এবং মন্দির প্রতিষ্ঠা উৎসবের জন্য অস্থায়ী মণ্ডপ। মণ্ডপের উত্তর দিকে মৃন্ময়ী মূর্তি সহ মনসাদেবীর মন্দিরটিও মার্বেল পাথরে গড়া। বাড়ির পাঁচিলের ধার ঘেঁষে অসংখ্য তাল, সুপুরি, আম, জাম, পেয়ারা, নারকেল প্রভৃতি ফলের গাছ। ইতিমধ্যে চা-জলখাবারের পর্ব শেষ হয়েছে। সবার সঙ্গে আলাপ পরিচয় করতে করতেই বেশ রাত হয়ে গেল। এতটা পথ জার্নিরও একটা ধকল ছিল। ফলে রাতের খাওয়া সেরে আমরা যে যার মতো শুয়ে পড়লাম।

পর দিন ভোরে উঠে প্রাতরাশ সেরে আমি ক্যামেরা কাঁধে একাই বেরিয়ে পড়লাম। উদ্দেশ্য গ্রামটার সবুজ সৌন্দর্য পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখা। প্রাসাদ বাড়িতে তখন পুজো ও হোমের আয়োজন চলছে। আজই মন্দির প্রতিষ্ঠা হবে। আমার ওসব পুজো পাঠ যাগ যজ্ঞের প্রতি আকর্ষণ নেই। বাংলাদেশের শ্যামল প্রকৃতি তখন আমাকে যেন কোন অদৃশ্য আকর্ষণে টানছে। দু’পাশে ঘন গাছগাছালির মাঝখান দিয়ে সরু ইট বিছানো রাস্তা। যত এগোচ্ছি ততই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাচ্ছি। মাথার ওপরে এত গাছপালা ছাতা ধরে আছে, বৈশাখের রুদ্রতাপ তো দূরের কথা একটা ঠাণ্ডা স্নিগ্ধ আমেজ শরীরটাকে জুড়িয়ে দিচ্ছে। সূর্যের আলো পাতার ফাঁক ফোঁকর দিয়ে এসে পথের ওপর জাফরির নকশা তৈরি করেছে। রাস্তার দু’পাশে যতদূর চোখ যায় কেবল সবুজ সবুজ আর সবুজ।

প্রায় গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সুপুরি, আম, জাম, কাঁঠাল, বাঁশের ঝাড়, আরো কতো নাম না জানা বুনো গাছের ঝোপ। একটু ফাঁকা জমিতে মান কচু, গুঁড়ি কচু, যজ্ঞ ডুমুর, শ্যাওড়া, আমড়া…কী নেই। আমার মনে পড়ে গেল বাংলাদেশেরই এক বিখ্যাত কবি জসীমউদ্দীনের কবিতার একটা লাইন—–‘ শ্যামলা বরণ বাংলা মায়ের রূপ দেখে যা আয় রে আয়’। দেখছি আর হাঁটছি আর ভাবছি এমন সবুজের সমারোহ আমাদের এপার বাংলার কোনো গ্রামে আজও অবশিষ্ট আছে কি ? দেহের চোখ দিয়ে দেখছি, মনের চোখ দিয়ে স্মৃতির নোটবুকে লিখে রাখছি আর আমার ক্যামেরার চোখ দিয়ে বন্দী করে রাখছি এইসব সবুজের চালচিত্র, কখনো স্থির চিত্রে কখনো গতিশীল চিত্রে। মাঝে মাঝে ঘন গাছগাছালির ফাঁকে উঁকি মারছে দু’ একটা গৃহস্থ বাড়ি। টিনের দেওয়াল, টিনের চালা, সামনে নিকানো উঠোন। উঠোনে খোঁটায় বাঁধা গরু জাবনা চিবোচ্ছে।

একপাল মুরগি ছানাপোনা নিয়ে কঁক কঁক আওয়াজ তুলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। খুঁটে খাচ্ছে ধানের তুষ। এক দঙ্গল হাঁস প্যাঁক প্যাঁক করতে করতে রাস্তা পেরিয়ে পাশের ডোবায় গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। গাছে গাছে টিয়া, হরবোলা, দোয়েল,বউ কথা কও, হট্টিটি….প্রভৃতি অজস্র রকমের পাখি বিচিত্র সুরে ডেকে চলেছে। একটা জিনিষ লক্ষ্য করলাম এখানে কারোর বাড়িরই কোনো সীমানা নির্দেশক পাঁচিল বা বেড়া নেই। কোথাও কোথাও বাড়ির পিছন দিকে কালো নোংরা জলের একটা দহ রয়েছে। আশপাশের বাড়ির কাঁচা নর্দমার জল এসে এখানে মিশেছে। এই দহগুলোকে স্থানীয় লোকেদের ভাষায় ‘ব্যাড়’ বলে। রাস্তার দু’পাশের বাঁশ গাছের মাথা নুইয়ে পড়ে একের সঙ্গে অন্যে ঠোকাঠুকি করছে। কোথাও কোনো জংলা গাছের ডাল যাওয়া আসার পথে এমনভাবে অনুপ্রবেশ করেছে যে তাকে হাত দিয়ে না ঠেলে এগোতে গেলে মাথায় ঠোক্কর খাওয়া অনিবার্য। ফলে ওপর দিকেও নজর রেখে চলেছি।

খানিকটা এগোতেই মাথার ওপর পাতপাতালির ছাতাটা সরে গেল। একটা খোলা জায়গায় এসে পড়লাম। ডানদিকে একটা বড় পুকুর। স্বচ্ছ টলটলে জল। হাঁসেরা দল বেঁধে সাঁতার কাটছে আঁকা বাঁকা রকমে। আর মাঝে মাঝে জলে ডুব দিয়ে গেঁড়ি গুগলি খাচ্ছে। রাস্তার দু’ধারে ইঁটের গাঁথনি করা দুটো কালভার্ট। নীচ দিয়ে বর্ষার জল এপাশ থেকে ওপাশে যাবার রাস্তা। একটা কালভার্টের ওপর বসে তিনজন গ্রামের লোক নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। সবাই খালি গা, পরনে খেটো লুঙ্গি, কাঁধে গামছা। আমি পুকুরে ভেসে বেড়ানো হাঁসেদের চলন ধরে রাখছিলাম ভিডিও ক্যামেরায়। একজন গ্রামবাসী আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করল, ‘মনে লয় আপনে এহানে নতুন আইছেন?’

আমি জবাব দিলাম, ‘ঠিকই ধরেছেন, আমি ইন্ডিয়া থেকে এসেছি’।

আবার প্রশ্ন, ‘জিগাই ক্যার বাড়িতে আইছেন ?’

আমার উত্তর, ‘আমি সত্যপ্রসাদ বাবুর বেয়াই। ওনাদের এই গ্রামের বাড়ির অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত হয়ে এসেছি’। 

এবার আরেকজন বলে উঠল, ‘ ও ! আপনে সত্য মাষ্টেরের বেয়াই? ওনারে তো ছোডবেলার থিয়া চিনি। উনি জুজখোলা হাই ইস্কুলে মাষ্টেরি করতেন। অনেক বছর আগে ইন্ডিয়ায় গ্যাছেন গিয়া’।

আমি আর একটু পরিষ্কার করে বললাম, ‘ হ্যাঁ উনি ইন্ডিয়ায় অনেকদিন ধরেই আছেন। কলকাতার কাছে একটা উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। এখন রিটায়ার করেছেন। সোদপুরের বাড়িতেই  থাকেন। উনিও এসেছেন আমার সাথে। ওনার ছোট ছেলে আমার জামাই। আমার মেয়ে জামাইও এসেছে’।

এদের মধ্যে রোগা পাতলা লোকটি তার পাশের জায়গাটিতে গামছা দিয়ে ধুলো ঝেড়ে বলল, ‘তয় হেইয়া…আপনে বয়েন না…বয়েন এহানে। অই গোপাইলগা সইরগা ব। ছ্যাররে বইথে দে’।

আমি নিঃসংকোচে গিয়ে বসলাম লোকটির পাশে। লোকটি লুঙ্গির কষি থেকে বিড়ি বের করে ধরাল। আমার দিকে একটা বিড়ি এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘ বিড়ি খায়েন?’ আমি সাধারণত বিড়ি খাই না, সিগারেট খাই। তবুও একজন অচেনা গ্রামবাসীর ভালোবাসার হাত বাড়ানো বিড়িটা না নিয়ে পারলাম না। ইতিমধ্যে বাকি দুজনও বিড়ি ধরিয়েছে। বিড়ি খেতে খেতে ওদের সঙ্গে অনেক গল্প হল। ওদের মধ্যে একজন মুসলমান, নাম ফজর আলি। বাকি দুজন হিন্দু। একজন গোপাল কৈবর্ত আর অন্যজন মদন মণ্ডল।

মদন স্বগতোক্তির ঢংয়ে বলে গেল, ‘এই সত্য ছ্যারের হাতে কম পিডান খাইছি ! উনি মোগো কেলাশে অঙ্ক হিখাইতেন। তবে সত্য ছ্যার অঙ্ক ছাড়াও বাংলা আর ইংরাজিতেও হিখ্খিম পণ্ডিত আছিলেন’।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনাদের এই গ্রামে হিন্দুর সংখ্যা বেশি না মুসলমান বেশি ?’

গোপাল জবাব দিল, ‘এই জুজখোলা গেরামে কয়েক ঘর মোছলমান থাকলেও হিন্দুর সংখ্যাই বেশি। তয় পাশের গেরামগুলায় গিয়া দ্যাহেন পেরায় হগলই মোছলমান’।

আমার পরের প্রশ্ন, ‘আপনাদের গ্রামে কখনো হিন্দু মুসলমানের মধ্যে দাঙ্গা হয় ?’

ফজর আলি গলা চড়িয়ে বলে ওঠে, ‘কী যে আজাইরগা কথা কয়েন মহায়। মোগো এই জুজখোলা গেরামে হিন্দু মোছলমানে খান্দার কেউ কোনোদিন দ্যাখছে না হোনছে ? আমরা হিন্দুর বাড়ি নিতা নেমন্তন্ন খাইতে যাই। হিন্দুরাও মোগো ঈদের পরবে বিরিয়ানি, সিমাইয়ের পায়াস খাইতে আহে। আপনের বেয়াই বাড়ির মনসা পূজায় গেরাম হুদ্দা নেমন্তন্ন। হিন্দু মোছলমান হগ্গলরেই ওহানে দ্যাখবেন হানে। এই গেরামে হিন্দু মোছলমান ভাই ভাই। কোনো মাইর দাঙ্গা নাই’।

বাকি দু’জন ‘হয়, হয়, হয়’ বলে মাথা নেড়ে তাতে সায় দিল। ওদের সঙ্গে আরো কথা বলে জানতে পারলাম, পিরোজপুর জেলা আগে বরিশাল জেলার অন্তর্গত একটি মহকুমা ছিল। এখন জেলা হয়েছে। ৭১ এর স্বাধীনতার পর দেশের অনেক উন্নতি হয়েছে। তবে জুজখোলা গ্রামের সঙ্গে পিরোজপুরের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার তেমন উন্নতি হয় নি। পুকুরের উল্টো দিকের জমিতে একজন চাষি ট্রাকটর দিয়ে জমি চাষ করছিল। আঙুল তুলে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওখানে কি বোরো চাষের বীজতলা তৈরি হচ্ছে ?’ মদন মণ্ডল আমাকে বুঝিয়ে বলল, বাংলাদেশে বীজতলা তৈরি করে ধান চাষের রেওয়াজ নেই। ভারতে বীজতলা তৈরির পর ধানের চারা বেরোলে সেই চারা তৈরি জমিতে রোয়া হয়। আর বাংলাদেশে তৈরি জমিতে ধানের বীজ ছড়িয়ে ধান বোনা হয়। তবে বাংলাদেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম জুজখোলায় জমি চাষে ট্রাকটরের ব্যাবহার দেখে বেশ অবাক হলাম।

জুজখোলার প্রাসাদে ফিরে আসতে দুপুর গড়িয়ে গেল। বাড়ির উঠোনে মণ্ডপের ভেতর মহা ধুমধামে চলছে মা মনসার পুজো। সাতজন পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণে পুরো বাড়ি গমগম করছে। মণ্ডপের বাইরে বাড়ির পুব দিকের জমিতে সাদা মার্বেল পাথরের একটা উঁচু স্মৃতি স্তম্ভ। নীচ থেকে ক্রমশ সরু হয়ে চারকোনা স্তম্ভটি ওপরের দিকে উঠে গেছে।সেই স্তম্ভের গায়ে নীচ থেকে ওপরে পর পর সাতটি খোপ রয়েছে। আমার বেয়াই মশাই তাঁর সহোদর ভাই এবং আর সব জ্যাঠতুতো, খুড়তুতো ভাইদের নিয়ে সেই স্তম্ভের বেদিতে বসে ফুল মালা সহযোগে উর্ধতন সাত পুরুষের উদ্দেশ্যে স্মৃতি তর্পণ করলেন। একজন পুরোহিত তাঁদের সকলকে তর্পণের মন্ত্র পড়ালেন। তারপর স্মৃতি স্তম্ভে প্রত্যেক পুরুষের নামাঙ্কিত খোপে ফুল মালা চড়ানো হল।

আমার গিন্নি কোথা থেকে এসে আমাকে পাকড়াও করে বলল, ‘তুমি এতক্ষণ কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলে ? মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়ে গেল, দেখতে পেলে না। অচেনা দেশে এসে যে একা একা ঘুরে বেড়াও, যদি হারিয়ে যাও কী হবে ? তুমি তো এখানকার রাস্তা ঘাট মানুষজনও চেনো না’।
আমি হেসে বললাম, ‘ওসব মন্দির প্রতিষ্ঠা টতিষ্ঠা তোমরা দেখো গে। আমি যা দেখে এলাম আহা ! এ জীবনে ভুলব না। বাংলাদেশের সবুজ প্রকৃতির কোনো তুলনা হয় না। এর মাঝে যদি হারিয়ে যাই নিজেকে ধন্য মনে করব’।

গিন্নি আমার দিকে খানিক হাঁ করে তাকিয়ে থেকে, ‘তোমার যা ইচ্ছে তাই করো’ বলে পুজো মণ্ডপের দিকে হাঁটা দিল। আমি দুপুরের খাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ির পশ্চিম দিকে খাবার প্যান্ডেলের দিকে পা বাড়ালাম। বিশাল প্যান্ডেলের নীচে অনেকগুলো ডাইনিং টেবিল পেতে খাওয়ার ব্যবস্থা। আজ বাড়িতে পুজোর অনুষ্ঠান। তাই মাত্র ৭ রকমের নিরামিষ পদের আয়োজন হয়েছে। ক্যাটারিং নয়। বাড়িতে রান্না করে বাড়ির ছেলেরাই পরিবেশন করছে। প্রধান রন্ধন শিল্পী মহঃ জিয়া। এই বাড়ির কেয়ারটেকার কাম রাঁধুনী। অবশ্য তার সহযোগী হিসাবে কয়েকজন মহিলাকে উৎসব উপলক্ষে অস্থায়ী নিয়োগ করা হয়েছে। আয়োজনের বহরে দেখছি বিয়ে বাড়িকেও পিছনে ফেলে দিয়েছে। বারাসাত থেকে আমাদের সঙ্গেই আসা আমার বেয়াই মশায়ের এক ভগ্নিপতি অশোকবাবুর ডাকে তার পাশের খালি চেয়ারটায় আমি খেতে বসে পড়লাম।

পরের দিন দুপুরে উৎসব উপলক্ষে মহাভোজের আয়োজন। পিরোজপুরের ডি.এম, পুলিশের এস.পি, বাংলাদেশ সরকারের চিফ সেক্রেটারি, ইউনিয়ন বোর্ডের সভাপতি এবং সরকারি মহলের অনেক হোমরা চোমরা আর সমাজের বিশিষ্টজন ছাড়াও গোটা গ্রামের প্রতিবেশিদের এই ভোজে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে। শুনলাম কাছেই একটি বন্ধ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল হলঘরে ক্যাটারিং ব্যবস্থায় প্রায় এক হাজার অতিথি আপ্যায়নের ব্যবস্থা হয়েছে।

আমি সেই কলেজর পাশ দিয়ে আজ চললাম গ্রামটার অন্য দিকটা ঘুরে দেখতে। এখন তো সবে ন’টা বাজে। দুপুরের মধ্যে ফিরে এসে ভোজসভায় যোগ দিলেই হবে। আমার সঙ্গী কেবল আমার ক্যামেরা। কাল অজস্র ছবি তুলেছি। আজও যত পারি বাংলাদেশের সবুজ মায়া দু’চোখ দিয়ে ভরে নেব মগজের কোষে আর ক্যামেরার চিপস্-এ। আজ সকালে যখন ভোজের জন্য বাজার থেকে মাছ এসে পৌঁছল চিত্তপ্রসাদ বললেন, ‘ লয়েন বেয়াইমশায় কোরাল মাছ দ্যাখবেন চলেন’। বাড়ির পিছনে সার্ভেন্ট কোয়ার্টারের উঠোনে দশ পনেরো কে.জি ওজনের গোটা দশেক মাছ ভাড়া করে আনা মেছোরা বঁটি, কুড়ুল, ছেনি, হাতুড়ি নিয়ে কাটতে বসেছে। আমি দেখে বললাম, ‘ এ তো ভেটকি মাছ’। চিত্তপ্রসাদ বললেন, ‘হয়, হয় ! আপনাগো দ্যাশে এয়ারে ভেটকি মাছ কয়। মোগো দ্যাশে আমরা কই কোরাল মাছ। খাইয়া দ্যাখবেন হানে কী হোয়াদ’। আমি মাছ কাটা দৃশ্যের কয়েকটা ছবি তুলে বেরিয়ে গেলাম জুজখোলার খোলা জানালার সন্ধানে।

একটা শান্ত পল্লীর পথ ধরে চলেছি। পথের দু’পাশে ঘন বসতি। আম, কাঁঠাল, বাঁশঝাড়ের ছায়ায় গৃহস্থ বাড়ি। বাড়ির পিছনে ধানের গোলা, খড়ের পোয়াল। কোথাও বউ ঝি’রা উঠোনের পাশে ডোবায় বাসন মাজছে, বাচ্চা ছেলেরা খেলে বেড়াচ্ছে। খানিক দূর হেঁটে আসার পর দেখি পথের ধারে একটা সুপুরি গাছের গায়ে লটকানো বিজ্ঞাপন—-‘ ফ্রেন্ডস কোচিং সেন্টার। শিক্ষক–অর্ণব দাশ ও প্রশান্ত দাশ। দাশপাড়া, জুজখোলা’। তিনটে বাচ্চা ছেলে কোথা থেকে এসে উদয় হল আমার সামনে। হাতে বই আর শ্লেট। জিজ্ঞেস করে জানলাম ওরা প্রাইমারি স্কুলে পড়ে। আমাকে ঘিরে ধরে বায়না ধরল ওদের ছবি তুলে দেবার জন্য। ছবি তুললাম। স্টিল ক্যামেরার এল.সি.ডি প্যনেলে ডিসপ্লে মোডে এনে ওদের ছবি দেখালাম। সে ছবি কোনোদিন হাতে পাবে না জেনেও কী খুশি। হাসতে হাসতে এগিয়ে গেল স্কুলের দিকে। আরো খানিকটা এগিয়ে চোখে পড়ল একটা ফ্রেম বাঁধানো ব্যানার কাফলা গাছের গুঁড়িতে টাঙানো। বাঁ দিকে একজনের রঙিন ছবি দিয়ে ছাপানো পোস্টার—–‘ মেসার্স হাইব্রিড শোভা নার্সারী / প্রো. মো. মোস্তাফিজুর রহমান (বাবু মিঞা) / যোগাযোগঃ কচুয়া, বাগেরহাট (কচুয়া জিরো পয়েন্ট। মীর মার্কেটের পিছনে ) / পেঁপে ফলে সবচেয়ে বেশি ভিটামিন / পেঁপে খেলে হজমশক্তি হবে প্রতিদিন’। সঙ্গে পেঁপে গাছে ঝুলন্ত কয়েকটি পেঁপের ছবি।

এরপর এমন একটা জায়গায় এসে পড়লাম, চারদিকে তাকিয়ে চোখ জুড়িয়ে যায়। কবি ডি.এল.রায়-এর মতো বলতে ইচ্ছে করে, ‘কোথায় এমন হরিৎক্ষেত্র আকাশতলে মেশে…’। দিগন্ত ছোঁয়া সবুজ ধানের খেত। জুজখোলার বাড়িতে আজ সকালে বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির সংবাদপত্র প্রথম আলোয় পড়ছিলাম এ বছর চৈত্রের শেষে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রচুর বৃষ্টি হওয়ার ফলে ব্রাহ্মণবেড়িয়া, সাতক্ষীরা, বগুড়া প্রভৃতি জেলায় অতিবৃষ্টিতে বোরো চাষের সমস্ত নীচু জমি জলের তলায় তলিয়ে গিয়েছে। হাওরের সব ধান নষ্ট হয়ে গেছে। পিরোজপুরে বোধহয় অতিবৃষ্টি হয় নি। তাই মাঠ জুড়ে সবুজ মখমলের মতো ধানের চারা বাতাসে কী সুন্দর মাথা দোলাচ্ছে। মনে পড়ে গেল আমাদের দুই বাংলার হৃদয়ের কবি, বিশ্বকবির বিখ্যাত সেই গানের লাইন—–‘ তোমার আঁচল ঝলে  আকাশতলে রৌদ্রবসনী’।

এমন সময় এক মা জননী আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। সত্তরোর্ধা বৃদ্ধাটি আমায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি ক্যাওর বাড়ি বিচরাইতে বাইরাইছো বাবা ?’  আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে জবাব দিলাম, ‘ না, আমি ইন্ডিয়া থেকে এসেছি এখানে এক আত্মীয়ের বাড়ি। আপনাদের দেশটা বড় সুন্দর। তাই দু’চোখ ভরে দেখতে বেরিয়েছি’। কথায় কথায় জানা গেল তাঁর দুই ছেলে ইন্ডিয়ায় থেকে চাকরি করে। আমি ভারত থেকে এসেছি শুনে আমাকে প্রায় জোর করে ধরে নিয়ে গেলেন কাছেই তাঁর বাড়িতে। বাড়ির সদর দরজার ওপরে সিমেন্টের চূড়ো করা খিলানে লেখা—-শ্রী শ্রী গৌরগোবিন্দ সেবাশ্রম। স্থাপিত ১লা মাঘ ১৩৮২, জুজখোলা, পিরোজপুর।

বাড়ির ভেতরে ঢুকে দেখলাম মন্দিরের আসনে রাধাকৃষ্ণের বিরাট মূর্তি। বৃদ্ধা জানালেন তিনি নিজেই রোজ গৃহদেবতার পুজো করেন। এই বাড়িতে তাঁর এক ছেলে, বৌমা ও ছোট্ট নাতিকে নিয়ে তিনি বাস করেন। দোল পূর্ণিমায় আশ্রমে উৎসব হয়। অনেক দূর দূর থেকে লোকজন আসে। আমার হাতে একটা পাকা কলা ও কিছু খই বাতাসা দিয়ে তিনি বললেন,

‘কী আর দিমু বাবা, ঘরে চাইড্ডি হুড়ুমও নাই। হুদা মুহে তোমারে ক্যামনে যাইতে দেই কও দেহি। তুমি মন্দিরের এই পেস্বাদটুক খাও বাবা’।

আমি খেতে দেখছিলাম বাড়ির উঠোনে ঢেঁড়স আর পুঁইশাক লাগানো হয়ছে। মাটির দেয়ালের ওপর খড়ের চালার ছাউনিতে বিশাল সাইজের চারটে পাকা চালকুমড়ো। মোটা কাছির মতো লতায় পাতা শুকিয়ে গেছে। মনে হচ্ছে চালকুড়োগুলোর গায়ে কেউ চুনের প্রলেপ লাগিয়ে দিয়েছে। মন্দিরের লাগোয়া একটা পাকা ঘরে খাট বিছানার সঙ্গে কাঠের আলমারি ঠাসা প্রচুর বই দেখে অবাক হলাম। ভাবলাম সবই বোধহয় ধর্মের বই। কাছে গিয়ে ভুল ভাঙল। সেখানে রামায়ণ, মহাভারত, ভগবদ্গীতার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণও তাঁদের আপন মহিমায় বিরাজ করছেন। একটা অদ্ভুত ভালোলাগা নিয়ে বেরিয়ে এলাম বৃদ্ধার কুটির থেকে।

জুজখোলার পালা শেষ করে আজ আমরা ও দুই বেয়াইয়ের পরিবার ঢাকার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছি। চিত্তপ্রসাদ সপরিবারে যাবেন ঢাকায় তাঁর নিজস্ব অ্যাপার্টমেন্ট বনানীতে। আর পরিবারসহ সত্যপ্রসাদ ও আমরা আগামীকাল সকালে ঢাকা স্টেশন থেকে মৈত্রী এক্সপ্রেসে কলকাতার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেব। দুপুর ২টো নাগাদ পিরোজপুরের হুলারহাট লঞ্চঘাট থেকে রকেট লঞ্চ এম.ভি.মধুমতির তিনতলার এ.সি কেবিনে সবাই মিলে চড়ে বসলাম। শুনেছি এই রকেট লঞ্চটি ইংরেজ আমল থেকে চলছে। অবশ্য কালে কালে এর প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণ হয়েছে। লঞ্চটি সত্যিই অত্যাধুনিক ও আরামপ্রদ। দু’দিকে টানা এ.সি কেবিনের মাঝখানে বিশাল লম্বা ডাইনিং টেবল। লঞ্চটির ভিতরে বসে বা শুয়ে থাকলে লঞ্চ যে চলছে তা টেরই পাওয়া যাবে না। মনে হবে নিজের ঘরে বসে বা শুয়ে আছি। এতটুকু ঝাঁকুনি বা হেলদোল নেই। চা খাবার সময় টেবিলে রাখা চায়ের কাপে চা একটুও চলকায় না।

এ.সি কেবিনের বন্ধ কাঁচের জানালা দিয়ে ঠিক নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় না। আমি ক্যামেরা নিয়ে লঞ্চের ছাদের ডেক-এ চলে গেলাম। সেখানে রেলিং দেওয়া পাটাতনের ওপর বসার জন্য কয়েকটি চেয়ার টেবিল রয়েছে। আমি পড়ন্ত বিকেলের আলোয় নদীর ক্রমশ বদলে যাওয়া রঙ উপভোগ করতে লাগলাম। মাঝেমাঝে মনোরম দৃশ্য দেখলে ক্যামেরাবন্দী করে রাখছি চকিতে ভেসে যাওয়া মুহূর্তগুলোকে। হুলারহাট থেকে শুরু করে পরপর যে নদীপথে আমরা ঢকার দিকে এগিয়ে চললাম সেগুলি হল—-সন্ধ্যা, রূপসা ক্যানেল(গাব খান),রূপসা,বিশখালি, সুগন্ধা, মেঘনা, পদ্মা  মেঘনার সঙ্গম, তারপর আবার মেঘনা এবং শেষে বুড়িগঙ্গা।

পদ্মা মেঘনার সঙ্গম দেখলে বুক কেঁপে ওঠে। কী বিপুল জলরাশি। এপার ওপার আকাশের সঙ্গে মিশে গিয়েছে। মনে হয় সমুদ্রের সঙ্গে এর তফাত কোথায় ? লঞ্চ পদ্মা মেঘনার সঙ্গমে পৌঁছয় ঠিক ভোর বেলা। এই সঙ্গমে দেখা সূর্যোদয়ের অপরূপ দৃশ্য আজীবন মনে থাকবে। দীর্ঘ জলযাত্রা পথে কতো নাম না জানা গ্রাম, গঞ্জ, শহর, জনপদ পেরিয়ে গেলাম তার ইয়ত্তা নেই। কোথাও নদীর বুক সরু তো কোথাও বিশাল চওড়া। কোথাও দু’পাশে ঘন সবুজ বনানীর মাঝে ইতিউতি দু একটি গ্রাম। কোথাও নদীর তীর জুড়ে ইটভাটা, কল কারখানা, মানুষের বসতি। সুগন্ধা, মেঘনার বুকে কতো সব আশ্চর্য জলযান আমার মতো স্থলমাতৃক চোখে বিস্ময় জাগিয়ে তুলছে। বাংলাদেশকে যে কেন নদীমাতৃক দেশ বলা হয় সেটা মর্মে মর্ম উপলব্ধি করলাম।

মেঘনার বুকে একসময় আমাদের লঞ্চের পাশাপাশি ভেসে এল কতগুলো পেল্লায় সাইজের লঞ্চ। কেউ সামনে কেউ পিছনে এগিয়ে চলেছে। দেখলাম বরিশাল-ঢাকা-বরিশালগামী চার তলা লঞ্চ সুন্দরবন-১০, ঢাকা-বরিশাল-ঝালকাঠিগামী এম.ভি.ফারহান-৭। আমাদের ঢাকা-চাঁদপুর-বরিশাল-মোতিগঞ্জ-ঢাকাগামী এম.ভি.মধুমতি মাঝে মাঝেই বিভিন্ন শহরের লঞ্চঘাটে থামছে। যাত্রী ওঠা নামা করছে। কাউখালি পৌঁছনোর পর আমাদের লঞ্চ যে ঘাটে থামল তার নাম কাউখালি মাটি আউয়াল ঘাটি। এরপর লঞ্চ থামল বরিশাল রকেট ঘাটে।

আমি আজও চোখ বুজলে দেখতে পাই, বরিশাল রকেট ঘাটের কাছে একটা বুড়ো বটগাছের মাথায় একটা ব্যানার ডেকে ডেকে বলছে—-‘ দেখো দেখো তোমরা সবাই আমার দিকে তাকাও। আমি ‘চন্দ্রবিন্দু ফ্যাশান হাউজ’। বাংলাদেশ রেডিমেড পোশাকের ব্যবসার নিরিখে সারা পৃথিবীতে প্রথম। বাংলাদেশে তৈরি আধুনিক পোশাক গোটা বিশ্বে রপ্তানী হয়। এই ব্যাবসায় বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।শুনেছি ঢাকায় পোশাকের বড় বড়  শো-রুমগুলিকে স্থানীয় ভাষায় আড়ং বলে। কী অদ্ভুত ব্যাপার, আমাদের দেশে আড়ং শব্দটার পরে অবধারিতভাবে ধোলাই শব্দটা আসে।

বাংলাদেশবাসীদের আতিথেয়তার কথা না উল্লেখ করলে এ গদ্য অসমাপ্ত থেকে যাবে। পিরোজপুর ছেড়ে চলে আসার আগের দিন রাতে আমার মেয়ের শ্বশুরবাড়ির এক আত্মীয়ের বাড়ি নেমন্তন্ন রক্ষা করতে গিয়েছিলাম। সন্ধ্যায় পৌঁছনোর পর চা বিস্কুট পর্ব শেষ হলে চলে এল পাকা আম আর তার সঙ্গে আইসক্রীম। এরপর রাতের খাওয়ায় শাকভাজা, শুক্তো থেকে শুরু করে এঁচোড়ের তরকারি, ফুলকপির ডালনা হয়ে ৭ রকমের মাছ (ইলিশের তিন রকম প্রিপারেশন ও চিতল মাছের মুইঠ্যা সহ), মুরগির মাংস, পাঁঠার মাংস, কাউঠ্যার মাংস, সঙ্গে কাঁকড়ার ঝোলও ছিল। শেষ পাতে আমের চাটনি, দই, রসগোল্লা, সন্দেশ, চমচম, লেডিকেনি, পায়েস,পাটিসাপটা পিঠা…..আরো কী কী ছিল এখন আর আমার মনে নেই। মোটামুটি একটা লোককে স্রেফ খাইয়ে মেরে ফেলার জোগাড়।

আমি তো কোন্ ছার রবিঠাকুরের দামোদর শেঠও বোধহয় এরকম আয়োজন দেখলে ছুটে পালাবে। এ দেশে পা রাখার পর থেকেই এ দেশের ভাষায় এ অধমকে শুনতে হয়েছে সে নাকি নিখাউন্তির দলে। খাবার টেবিলে আমাকে ঘিরে একাধিক ফিল্ডার আর উল্টোদিক থেকে একের পর এক বোলার ইনসুয়িং, গুগলি, বাউন্সার আইটেম সার্ভ করে যাচ্ছিল। সব ক’টা বলই নাকি আমাকে খেলতে হবে। একটাও পাশ কাটিয়ে গেলে চলবে না। অত্যাচারের শেষ সীমায় পৌঁছে আম্পায়ারের মতো আমি থালার ওপর ঝুঁকে কনুই থেকে হাত দুটো আড়াআড়ি ক্রশ করে প্রবল বেগে দু দিকে নাড়তে থাকলাম। চলে আসার সময় পিছন থেকে শুনতে পেলাম কে যেন কাকে চাপা গলায় বলছে, ‘কোন্ লোম্বার খাওনডা খাইলেন তোমার বেয়াই? নির্ঘাৎ ব্যাডার প্যাডের খোল ছোড’।

ভোরবেলায় লঞ্চ বুড়িগঙ্গায় ঢুকল। বুড়িগঙ্গার জল দেখে আমাদের আত্মারাম খাঁচা ছাড়া। নিকষ কালো রঙের জল। একটা কটু দুর্গন্ধ ভেসে আসছে। নদী পাড়ের শিল্প এলাকার এবং ঢাকা শহরের সমস্ত বর্জ্য পদার্থ এসে মিশেছে এই জলে। মরা কুকুর বেড়ালও ভেসে যেতে দেখলাম। ঢাকা শহরে ঢোকার আগে বুড়িগঙ্গার ওপর একটা ব্রিজ আছে। ব্রিজের কানাতে লেখা—–নদী দূষণ রোধে জনমত গড়ে তুলুন। আগের দিন দুপুর ২টোয় হুলারহাট থেকে রওনা হয়ে পরের দিন সকাল ৬টায় আমরা ঢাকা পৌঁছলাম। লঞ্চঘাটে চিত্তপ্রসাদের গাড়ি অপেক্ষা করছিল। চিত্তপ্রসাদ তাঁর পরিবার নিয়ে দুটো গাড়িতে বনানী রওনা হয়ে গেলেন। যাবার আগে হাতজোড় করে আমাদের বিদায় জানালেন এবং এরপর এসে তাঁর ঢাকার বাড়িতে কয়েকদিন থাকার আমন্ত্রণ জানালেন। চিত্তপ্রসাদের আর দুটো গাড়ি আমার আর আমার বেয়াই মশায় সত্যপ্রসাদের পরিবারসহ ঢাকা রেলস্টেশনের দিকে এগিয়ে গেল।

মৈত্রী এক্সপ্রেসের ঠাণ্ডা কামরার বন্ধ কাঁচের জানলা দিয়ে আবার চোখে পড়ল বাংলাদেশের শ্যামল সবুজ শোভা। শস্য খেত, পটল খেত, উচ্ছে করলার খেত, ঢেঁড়স খেত, ঝিঙে খেত, গ্রামের পথ চলতি মানুষ, পুকুরে ঝাঁপানো কিশোরের দল, রেল লাইনের ধারে চায়ের দোকানে পল্লি-মজলিশ ছবির মতো সরে যেতে থাকল পিছন দিকে। না থেমে চকিতে দেখা দিয়ে গেল টাঙ্গাইল, বঙ্গবন্ধু সেতু, চাটমোহর, ঈশ্বরদী জংশন প্রভৃতি স্টেশন। ট্রেনের চাকা গড়িয়ে চলেছে এক বাংলার সীমান্ত দর্শনা পেরিয়ে আর এক বাংলার গেদে সীমান্তের দিকে। আমার স্বদেশ আমার জন্মভূমির টানে ফিরে চলেছি। বরিশাল জেলার এক কবি যেন কানের কাছে ফিসফিসিয়ে উঠল—-‘ আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে এই বাংলায়….’।


রমেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য : কবি গল্পকার ঔপন্যাসিক প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক। প্রকাশিত গল্প গ্রন্থ-শান বাঁধানো জীবন, কাব্য সংকলন-অনিকেত জীবন, উপন্যাস-মোমের আলো, অরণ্য দুয়ার খোলা। অবসরপ্রাপ্ত ব্যাঙ্ককর্মী।পুষ্প চর্চা ও ভ্রমণ অন্যতম নেশা। মূলতঃ অবাণিজ্যিক পত্র পত্রিকায় লেখেন। ইসক্রা, অল্প কথায় গল্প, ইচ্ছেকথা, সংবাদ খোলাখুলি….প্রভৃতি পত্রিকার নিয়মিত লেখক।

 আরও পড়তে পারেন…..
সম্পাদকীয় ।। ফয়সাল আহমেদ
রাজপুত্তুরের গল্প ।। সোমেন চন্দ
তবুও বাঙালি ।। তাপস দাস

About the author

নরসুন্দা ডটকম