গদ্য

জলেশ্বরী যাত্রার আগে-সৈয়দ কামরুল হাসান

নরসুন্দা ডটকম   অক্টোবর ৩, ২০১৬
১.
২৮ সেপ্টেম্বর,২০১৬ । শহীদ মিনার,ঢাকা । স্টেজের পেছনে একটি কালো কাপড়ের ওপর শাদা তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে-তোলা মৃত্যুর আবহে কবির নামটি মানুষের কালো কালো মাথার আড়ালে ঢাকা পড়ছিল । খানিক তফাতে সরে গিয়েও বহুদূর থেকে গড়িয়ে আসা নারী-পুরুষের দীর্ঘ সারির লেজখানা কিছুতেই গোচরে আসছিল না -এ যেন অনি:শেষ । না,সুশৃংখল নয় তেমন। কার আগে কে আসবেন কিংবা কার কাঁধে কে চড়ে বসবেন এমনি ধারায় এগুচ্ছিল লাইন । সংগঠন তো আছেই, এসেছেন চেনা ও অচেনা অনেকে। সবার হাতেই যে ফুল এমন নয়;কফিনে এক নজর ফেলতে না ফেলতেই হুমড়ি খেয়ে এগিয়ে যেতে হচ্ছে ।
বিশিষ্ট একজন সংস্কৃতি-সংগঠক কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব নিয়েছেন মাইক্রোফোন হাতে তারস্বরে ঘোষণা করে জানিয়ে দেওয়ার-যাতে বিশিষ্ট কোন ব্যক্তি কিংবা সংগঠন বাদ না যায় কোন ভাবেই । সকলকে তিনি চেনেন বলে সুবিধাও হয়েছে বুঝি তার ! এসেছেন নানা অংগনের মানুষ-শিল্পী, কলাকুশলী, লেখক,সাংবাদিক -সব্যসাচির সূতোয় এতকাল বাঁধা পড়েছিলেন যারা।
মুখ-দর্শন পর্ব শেষ করেছেন যারা তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছেন ঘাসে, বেদীর সিঁড়িতে। অনেক দিন পর দেখা হয়েছে কারুর সংগে কারুর-এমনকি যৌবনে বিছ্ছিন্ন হওয়ার পর ফের দেখা এই প্রবীণ বয়সে এই শহীদ মিনারে এসে, তাই ছবি ও সেলফি তোলার ব্যস্ততা। যে কয়েকজন মন্ত্রী ও কর্তাব্যক্তি(বর্তমান ও সাবেক) কফিনের আশপাশে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছেন, তারা ছাড়াও আরো যারা আসবেন বলে কথা রয়েছে-সে-কথা জানান দিচ্ছে পুলিশের মূহুর্মূহু বাঁশী ।
তবে সবাইকে টেক্কা দিয়েছে ইলেকট্রিক চ্যানেলের একদল তরুণ-তরুণী । বড় বড় ক্যামেরা তাক করা -পাশে দাঁড়িয়ে ধারা বিবরণী চলছে – লাইভ সমপ্রচার। ক্যামেরাম্যান ও ধারাভাষ্যকার ছাড়াও; চ্যানেলের আরেক দল সক্রিয় -অনেকটা ঢেউয়ের মাথায় ওৎ পেতে বসে মাছ শিকারের মত কে কার আগে বিশিষ্ট কাউকে পেলেই চটজলদি ভীড়ের জট ছাড়িয়ে নিয়ে তাকে ক্যামেরার সামনে ঠেলে দিতে পারছেন—”স্যার আপনার প্রতিক্রিয়া বলুন ।” বিশিষ্ট একজন গলা খাঁকারি দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেছেন : ”হ্যাঁ,রবীন্দ্রনাথের পরে —-”ক্যামেরা চলছে ! কানে আসছে ২ জন সম্প্রচার কর্মী উত্তেজিত ,নিচু স্বরে কথা বলছে নিজেদের মধ্যে – সৈয়দ হকের কোন বইটা পড়া আছে তোর–কি, নাম মনে নাই ?–হুঁ দাঁড়া — ইউটিউব থেকে নামিয়ে নিই –এই যে পাইছি,”পরানের গহীন ভিতরের” আবৃতিটা -রিপোর্টে জুড়ে দিলে একেবারে জম্পেশ !
এইসব শুনে ও দেখে জলেশ্বরীতলার জাদুকর কি আপন কফিনের গহীনে শুয়ে মৃদু মৃদু হাসছেন ?
২.
এটুকু অন্ত:তপক্ষে সত্য যে , সৈয়দ হকের প্রয়াণ স্বাভাবিকের চেয়েও বেশি বই কম নয় । কেননা ৮১ বছর বয়সে তাঁর সময়ের আর মাএ ২/১জন মৃত্যুপ্রতীক্ষায়, বাকীদের সবাই -এমনকি তাঁর চেয়ে কম বয়সেরও অনেকেই লোকান্তরিত। জীবন মান বিবেচনায়ও তাঁর অবস্থান উচ্চস্তরের। তিনি সফল প্রেমিক, সার্থক পিতা, আহার-বিহার-অসন-ব্যসনে তাঁর ভোগ ও সিদ্ধি নজরকাড়া । সাহিত্যিক সাফল্যেও তিনি শীর্ষস্পর্শী । অতি অল্প বয়সেই চলচিত্রের গান ও চিএনাট্য লিখে হিট হয়েছেন;সবচেয়ে কম বয়সে এসেছে বাংলা একাডেমী সম্মাননা।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও মহান কৃষক বিদ্রোহ নিয়ে নাটক(কাব্যনাট্য) লিখে দর্শকচিত্ত তোলপাড় করেছেন, কথাসাহিত্য, কবিতা ও অনুবাদে দেখিয়েছেন সৃজনশীলতার পরাকাষ্ঠা । এমনকি সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ ও কলাম লিখে লিখে নিজ শক্তিমত্তার স্বাক্ষর রেখেছেন। শুনেছি,দেখিনি বটে;রং-তুলি-ক্যানভাস সহযোগে ছবিও এঁকেছেন তিনি। দেশের সেরা পুরস্কারের সবক’টি গিয়েছে তাঁর ঝুলিতে। পেয়েছেন সকল স্বীকৃতি,আপ্যায়ণ, সম্মান —–  কি পাননি তিনি;এমনকি ”রাজানুগ্রহ” পর্যন্ত ! বলতে কি জীবন ও সাহিত্য উভয় তরফে তাঁর সাফল্য তাঁকে একরকম বরপুএের মর্যাদা দিয়েছে।
তাঁকে কি মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত অবহেলায়, অর্থকষ্টে যক্ষায় ধুঁকে ধুঁকে মরতে হয়েছে ? বনগ্রাম কি ঘাটশীলার মত নিভৃত পাড়াগাঁ থেকে একহাঁটু ধূলিভরা ধুতি-পরা বিভূতিভূষণের মত কাঁধের ঝোলায় ”পথের পাঁচালী”র মত মহাকাব্যিক উপন্যাস নিয়ে প্রকাশকের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছে? আত্মজৈবনিক রচনা ”তিন পয়সার জ্যোছনা” সাক্ষ্য দিচ্ছে সৈয়দ হকের সাহিত্যিক জীবন উদযাপনের মধুর গল্প !
অতএব,তাঁর মৃত্যুপরবর্তী উদ্যোগ আয়োজন যে আমাদের হাতে নিতান্ত উৎসবে রূপ নিতে পারে সে-ঝুঁকি থেকেই যায়! জলেশ্বরীতলার জাদুকর কি প্লেনে চড়ে(গরুর গাড়ি নয়) ”চেনা ঠিকানায়” যাবার আগে সে-কথা ভেবেই নিজের কফিনে শুয়ে একচোট হেসে নিয়ে পাশ ফিরে শুয়েছিলেন ?
৩.
সৈয়দ শামসুল হক যে প্রতিভাদীপ্ত, নিরীক্ষাধর্মী ও তীব্র এক মেধাবী শিল্পী -সে কথা জানতে পাই দিনে দিনে। সত্তরের শেষদিকে আমাদের মফস্বল শহরের পাবলিক লাইব্রেরীতে এক সন্ধ্যার আলো আঁধারে প্রথম পড়ি তাঁর বিখ্যাত বড় গল্প-”রক্তগোলাপ”। এরও আগে তাঁর সমসাময়িক শক্তিমান লেখক আলাউদ্দিন আল আজাদ ও আবদুল গাফফার চৌধুরীর রচনার সংগে পরিচয় হয়েছিলো । মহান কথাসাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ , শওকত ওসমান ও আবু ইসহাক তাঁর কিঞ্চিৎ পূর্বসূরী ।  কিছু পরে জহির রায়হান ও শহীদুল্লাহ কায়সারের রচনার সংগে পরিচয় হয়েছিলো।
”রক্তগোলাপ”পড়ে মনে হলো এই লেখক কিছুটা ভিন্নতর,নিরীক্ষাধর্মী,আধুনিক এবং ভাষাবিন্যাস ও গল্পের পরিনতি বিবেচনায় অনেকখানি কাব্যিকও বটে । এই লেখক যে একজন সেরা আধুনিক কবি অল্পদিন পরেই তা স্বীকার করি তাঁর অসাধারণ রচনা ”বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা ” পড়ে । বছর খানেক পর পড়ি তাঁর বড় উপন্যাস :”খেলারাম খেলে যা ।” উঁচুতলায় ব্যক্তির সংকট ও পরিণতি নিয়ে আমাদের প্রথম পর্যায়ের আধুনিক উপন্যাসগুলির একটি। পাঠকের স্বাভাবিক প্রবণতায় তাঁকে বৃত্তাবদ্ধ করে ফেলার আগেই অনেকটা ঘটনাচক্রে দেখি ”সুতরাং” ছবিটি । জানতে পাই এই ছবির গান, চিএনাট্য তাঁরই রচনা । গ্রামজীবনের সরল ছবি তাঁর ছোঁওয়ায় চিরকালীন হয়ে উঠেছে-ছবিটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার বয়ে এনেছিল।
অত:পর আয়না ও অবশিষ্ট, কখনো আসেনি, শীতবিকেল, কাগজের নৌকা, কখগঘঙ, ময়নামতি এবং এমনকি সবশেষে আধ্যাত্মিকতার উপর নির্মিত আমাদের এখানকার সেরা ছবি-বড় ভালো লোক ছিল দেখার পর বুঝতে পারি নিছক কবি কিংবা কথাশিল্পীর বৃত্তে বন্দী হবার নন তিনি । তাঁর বহুমাএিকতা তিনি দিনে দিনে আমাদের কাছে মূর্ত করে তুলেছেন ।
নতুন নতুন বিষয়,ভাষা শৈলী/প্রকাশভংগী ও প্রকরণ বৈচিএ্যে তিনি বার বার ভেংগেছেন নিজের বৃত্ত, নিজেকে ছাপিয়ে নতুন করে তুলে ধরেছেন।
এও ঠিক যে, ইতোমধ্যে দেশ স্বাধীন হয়েছে, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার ক্ষুদ্র, অন্ধ বিবর ছেড়ে যে-কোনো খাঁটি শিল্পীর মত তিনি এসে দাঁড়িয়েছেন একটি সদ্য-স্বাধীন বিশাল বিস্তৃত ভূ-খন্ডে । এবার তিনি সুযোগ পেলেন কাজ করবার আরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে,নিজেকে আরো ভেংগেচুরে, পরীক্ষা নিরীক্ষায়। এরই ফসল :পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, নূরলদীনের সারা জীবন, পরানের গহীন ভিতর, প্রাচীন বংশের নি:স্ব সন্তান, দূরত্ব, নিষিদ্ধ লোবান, বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ, মার্জিনে মন্তব্য কিংবা হৃদকলমের মত রচনা। সেইসব রচনার কোথাও ক্লান্তির ছাপ নেই, মেদহীন, ধারালো এক একটি রচনা, সর্বোপরি একটির তুলনায় অপরটি আলাদা-বিষয়বস্তুতে, উপস্থাপনায়,গুনে, মানে, স্বাদে। অভিধা একরকম আদায় করে নিয়েছিলেন তিনি।
সর্বঅর্থে স্মার্ট, ঝকঝকে এবং তাঁর রচনার মতই ভিন্নধর্মী ও সপ্রাণ এই সব্যসাচির সংগে সামান্য যে-টুকু দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে তাতে মুগ্ধতাই বেড়েছে আমার, বিস্মিতও যে হইনি সে-কথা বলি কি করে ?
৪.
সৈয়দ শামসুল হক কত বড় মাপের শিল্পী ও আমাদের সাহিত্যে তাঁর স্থান কোথায় সে-কথা লিখবেন বড় ও বিজ্ঞ সমালোচকরা-তাঁরা এখন তৈরি হচ্ছেন । তাঁরা খুঁটিয়ে খুঁচিয়ে দেখবেন : তাঁর রচনায় কোথায় আমাদের আশাভংগের বেদনা, কোথায়ই বা আমাদের গোষ্ঠীতন্ত্রের সমালোচনা, কোথায়ই বা কাঠামোগত লুটপাটের অনুপুংখ সমালোচনা – এ’তো দেখছি পাতার পর পাতা কবিতা ,গান আর রোমাণ্টিকতা —এ’কি শুধুই কল্পনাবিলাস না’কি মহত্তর কবিতা !
পড়ে আছে বিস্তীর্ণ মহাকাল – সে বেছে নেবে কার অবদান কতটুকু-কার জুটবে অমরত্ব ! প্রকৃতপক্ষে, তাঁর আপন রচনায়, পরিবেশনায়, উপস্থাপনায় সতত মুখর সৈয়দ হক রাএিদিন এতটাই আবিষ্ট করে রেখেছেন আমাদের একটি বার ফুরসতই হয়নি ভেবে দেখার কখন যে কোন ফাঁকে ”রক্ত গোলাপে”র জাদুকর তাঁর নিজের ও আমাদের কাল জয় করে বসে আছেন !
আপাতত জলেশ্বরীর জাদুকরের সংগে থাকুক আমাদেরও অপেক্ষার পালা !
০২.১০.২০১৬,ঢাকা
 
kamrul

সৈয়দ কামরুল হাসান: লেখক, গল্পকার।

নোট: সৈয়দ হকের ছবি সংগ্রহ।

About the author

নরসুন্দা ডটকম