গদ্য

কৃষ্ণপুর-রাণীনগরের জমাদারতলা: বিষন্ন শীতঘুমে আমার প্রেমিক- গৌতম অধিকারী

নরসুন্দা ডটকম   ডিসেম্বর ১৭, ২০১৮
Spread the love
  • 71
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    71
    Shares
রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে কৃষ্ণনগর রাজসভার বর্ণনা দিতে গিয়ে একস্থানে লিখেছেন,-
    ” সেপাহীর জমাদার মামুদ জাফর।
      জগন্নাথ শিরোপা করিল যার পর।।”
কৃষ্ণনগরের মহারাজার ‘সেপাহীর জমাদার’ এই মামুদ জাফরই চূর্ণীতীরের খ‍্যাতকীর্তি জমাদারতলায় শায়িত আমার ‘মনের মানুষ’ পীরসাহেব জাফর খাঁ। আমি আজ ‘মনের মানুষ’টিকে খুঁজতে চলেছি। একটু ভুল হলো বোধহয়! আসলে তিনিই তাঁর অসীম প্রেমের টানে আমাকে বারবার নিয়ে যেতে চান তাঁর কাছে। আজও এনেছেন এই শীতসন্ধেবেলায়। আমরা মুখোমুখি। চূর্ণীস্রোতের অলৌকিক স্নেহধারায় সিক্ত হতে হতে আমি গিয়ে নামি তাঁর ঘাটে। কথা বলি তারঁ সঙ্গে। মেলাতে চাই তাঁর সঙ্গে নিজেকে। কিন্তু ঐ যে বলে না ‘লাখ লাখ যুগ হিয়ে হিয়ে রাখলু তবু হিয়া জুড়ন না গেল।’ আমার প্রেমিক বৃন্দাবননন্দনের মতো নিষ্ঠুর নন ঠিকই, বড়ো অভিমানী। তাঁর অভিমান ভাঙাতেই বারবার আমার হৃদয়তরী ভেড়ে  তাঁর ঘাটে।
সবাই বলে জমাদারসাহেবের ঘাট। একটু দূরে রাণীনগর খাল। পাশাপাশি দুটো গ্রাম — কৃষ্ণপুর ও রাণীনগর। কৃষ্ণপুর কৃষ্ণগঞ্জ ব্লকে, রাণীনগর হাঁসখালি ব্লকের মধ্যে। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দুই রাণীর স্মৃতিতেই গ্রামের নাম। এই গ্রামসীমানায় চুপচাপ শুয়ে আছেন আমার পরকীয়া জীবনের এক সখা-বান্ধব-প্রেমিক। বড়ো অভিমান তাঁর। সঙ্গত কারণও আছে। কেউ তো মনে রাখেনি তাঁকে। শুধুই আশেপাশের গ্রামের অতিসাধারণ স্বজনেরা ছাড়া। নৈঃশব্দ্যের চাদরে শরীর মুড়ে ঘুমিয়ে আছেন তিনি। দুই শতাব্দীর ইতিহাসের উপেক্ষায় তিনি তো ক্লান্ত। আমার সাধ‍্য কি অবসন্ন এই শীতঘুমের প্রহরে ইতিহাসের পাথর খুদে তাঁকে প্রাণবন্ত করি। সেই অলৌকিক ক্ষমতা তো আমার নেই। তবে তাঁর ছিল– এমনটাই বলে ইতিহাস। নিজের সেই ক্ষমতাবলে আমার অস্তিত্বে আজ বেঁচে উঠুক আমার প্রেমিক স্বজনের অকথিত কথকতা।
আমার প্রেমিক মানুষটি অলৌকিক শক্তি ধরতেন – এমন কথা আমিও শুনেছি। সে শক্তির কথা না হয় পরে জানা যাবে। কিন্তু তিনি তো লৌকিক। সম্পূর্ণ এক মানবিক অস্তিত্ব নিয়ে তাঁর ঐতিহাসিক উপস্থিতি ছিল সুবে বাংলার নবাব আলীবর্দী খাঁর সেনাদলে। ড. মদনমোহন গোস্বামীর ‘রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র’ গ্রন্থের তথ‍্য অনুযায়ী আলীবর্দী খাঁর সেনাবাহিনীতে উড়িষ্যা- অভিযানে  তিনি যুদ্ধে নৈপুণ্য দেখিয়ে ভারতচন্দ্র কথিত ‘জগন্নাথ শিরোপা’ অর্জন করেছিলেন। জাতীয় অধ্যাপক আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় Krishnagar College Centenary Commemoratin volume (1948)-এ লেখা ‘The Court of Raja Krishna Chandra of Krishnagar’ শিরোনামের একটি রচনায় বলেছেন, ‘In the Raja’s armed forces, a Muslim — he might have been bengali, or one from upper India, Mhamud Jafar by name, was the chief ( Sepahir Jamadar ). He had evidently distinguished himself in the Orissa Campaign of Aliwardi Khan, for it was said by Bharatchandra that Jagannath made a prsent of a robe of honour to him, Cap-a-pa ( Sar-o-pa ) ; which probably is to taken to the mean that he was honoured in Puri when the Bengali army was before the temple of Jagannath.”
অর্থাৎ জাফর খাঁ উড়িষ‍্যা অভিযানে যে নবাব আলীবর্দী খানের সৈন্যদলে ছিলেন, এই তথ‍্যে কোনো বিতর্ক নেই। সেই যুদ্ধে তাঁর বীরত্বের জন্য জগন্নাথ নামের কোনো মহাজন ব‍্যক্তি তাঁকে শিরোপা বা পুরস্কার দিয়েছিলেন বলে দেবেন্দ্রনাথ বসু তাঁর সম্পাদিত ‘অন্নদামঙ্গল’-এর টীকায় উল্লেখ করেছেন। বসু মহাশয়ের মতে,
     ” বোধহয় এই জগন্নাথ বৈদ‍্যতিলক রায়ের
       ছোট ভাই ,হইবেন।”
বৈদ‍্যতিলক উড়িষ্যার একজন ক্ষুদ্র নৃপতি। কথিত আছে নদীয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্রও সসৈন্যে আলীবর্দী খাঁর এই অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন এবং জাফর খাঁর বীরত্বে চমকিত হয়ে আলীবর্দী খাঁর কাছ থেকে জাফর খাঁকে নিজের সিপাহশালার করে নিয়ে আসেন কৃষ্ণনগরে। তখন থেকেই সারাজীবন রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ বন্ধুরূপেই জাফর খাঁ জমাদারের জীবন অতিবাহিত হয়। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র শিবনিবাসে নতুন রাজধানী স্থাপন করে সপরিবারে বসবাস শুরু করলে সঙ্গে নিয়ে আসেন জাফর খাঁকে। তাঁর শেষ জীবন এখানেই অতিবাহিত হয়। কৃষ্ণচন্দ্রের প্রয়াণের (১৭৮২ ) আগেই তিনি প্রয়াত হন। তবে শিবনিবাসে বাসকালে জাফর খাঁ আর মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সিপাহসালার ছিলেন না, হয়ে উঠেছিলেন তাঁর সখা, বান্ধব এবং ভক্তিপথের আশ্রয়।
সিপাহশালার থেকে আধ‍্যাত্মিক মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিলেন জাফর খাঁ কৃষ্ণনগর বাসকালেই। এ বিষয়ে একটি গল্পকথা ভালোভাবেই প্রচলিত। কৃষ্ণনগর রাজসভায় জাফর খাঁর স্থান ছিল অত্যন্ত মর্যাদাময়। রাজা স্বয়ং তাঁর গুণগ্রাহী। রাজপ্রাসাদের জরুরি আলোচনায় জাফর খাঁ অনিবার্য। কোনো একদিন খানিকটা অপ্রত্যাশিত ভাবে জাফর খাঁর অনুপস্থিতিতে মহারাজা বিচলিত হয়ে তাঁর বাসভবনে লোক পাঠিয়েছেন তাকে ডেকে নিয়ে আসার জন্য। কিছুক্ষণ পরে খবর এলো, যা শুনে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র তো বটেই সভাসদরাও পড়লেন উদ্বেগে। যে লোকটা ডাকতে গিয়েছিলেন, তিনি গিয়ে দেখেন, জাফর খাঁর ঘরের দরজা বন্ধ। ডেকেও মিলছে না কোনো সাড়া। উঁকি দিয়ে দেখেন, ঘরের মধ্যে জাফর খাঁ পাগলের মতো ছটফট করছেন, পায়চারি করছেন- ছিঁড়ছেন নিজের মাথার চুল। বিভ্রান্ত মানুষটির মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁকে ডাকতে আসা মানুষটা ভয় পেয়ে ফিরে এসেছেন। কালবিলম্ব করেননি মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র। সপার্ষদ ছুটলেন জাফর খাঁর বাড়ি। খবরটা ভুল ছিল না। কয়েকবার ডাকাডাকি করে মহারাজা সম্ভবত কিছু অনুমান করে অপেক্ষা করতে লাগলেন। অপেক্ষার প্রহর শেষে ঘর নিজেই খুলে বেরিয়ে এলেন জাফর খাঁ স্বয়ং। চেহারায় সেই বিভ্রান্তি আর ততটা নেই। বরং খানিকটা শান্ত ও সমাহিত। বললেন, ” সর্বনাশ থেকে রেহাই পাওয়া গেছে মহারাজ।” “সর্বনাশ!”– বিষ্ময় সবার চোখেমুখে। জাফর খাঁ জানালেন, পুরীতে জগন্নাথদেবের রথে আগুন লেগে গেছিল। অনেকসময় ধরে আগুন নেভাতে পারা যাচ্ছিল না। তবে পরে বিপদমুক্ত হয়েছে রথ। তাৎক্ষণিকভাবে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র কিংবা আর সবাই এইকথা বিশ্বাস করেছিলেন কি না জানা যায় না। কিন্তু কিছুদিন পর যখন খবর পাওয়া যায় , সত‍্যিসত‍্যিই ঐদিন জগন্নাথদেবের রথে লেগেছিল আগুন। আর এই ঘটনার সূত্র ধরে জাফর খাঁর অলৌকিক ক্ষমতার কথা ছড়িয়ে পড়ে। তখন মনে হয়, জাফর খাঁর এই মহিমার কথাই কি বলেছেন রায়গুণাকর তাঁর ‘অন্নদামঙ্গল’কাব্যে ? –
     “সেপাহীর জমাদার মামুদ জাফর।
      জগন্নাথ শিরোপা করিল যার পর।।”
আমার কিন্তু তাই মনে হয়। জগন্নাথদেবের সঙ্গে এই তন্নিষ্ঠ সম্পর্কের কাহিনিই তাঁকে আধ‍্যাত্মিক মহাপুরুষের ‘শিরোপা’ এনে দিয়েছিল। যে কথাটাই বলতে চাইলেন রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র। আর মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও তাঁর দুই রাণী জ‍্যোতির্ময়ী ও স্বর্ণময়ী হয়ে উঠেছিলেন জাফর খাঁর মুরিদ বা শিষ‍্যের মতো। এমনকি জাফর খাঁর তিরোধানের পর তাঁর দেহ কৃষ্ণনগরে সমাধিস্থ করার কথা উঠলেও মহারাণীরা আপত্তি করেন। তাঁদের দাবি ছিল নিজেদের নামের সঙ্গে যুক্ত নবগঠিত গ্রাম রাণীনগরেই সমাধিস্থ করতে হবে পীরসাহেব জাফর খাঁকে। সেই দাবি মেনেই রাণীনগর ও কৃষ্ণপুর সীমানায় সমাহিত করা হয় কৃষ্ণচন্দ্রীয় যুগের সাধক জাফর খাঁ-কে। স্থানীয় মানুষদের কাছে শুনেছি, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র যতদিন শিবনিবাসে ছিলেন, প্রতিদিন খুব ভোরবেলায় শিবনিবাস থেকে হেঁটে আসতেন রাণীনগর, কাছাকাছি একমাইল পথ হেঁটে। আসতেন মাজারকে ডানহাতে রেখে। মাজার ঘুরে শ্রদ্ধা নিবেদন করে চূর্ণীর পাড়বরাবর রাস্তা দিয়ে ফিরে যেতেন শিবনিবাসে। হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য মানবতার কথা বলতেন এই সাধকপুরুষ। চূর্ণীতীরবর্তী জনপদের এক মহান উত্তরাধিকারও বটে।
জাফর খাঁ-র অলৌকিক মহিমা, মানবিক সাধনার কথা চূর্ণীতীরের মানুষের মধ্যে সমধিক পরিচিত। এর প্রভাব পড়েছিল রাণীনগরের নীলকুঠির মালিক হবসন সাহেবের উপরেও। শিবনিবাসের রাজন‍্যপ্রতাপ তখন অস্তমিত। ছোট্ট রাজ‍্য হস্তান্তরিত হয়েছে স্বরূপনগরের জমিদার বৃন্দাবন সরকার চৌধুরীদের হাতে। চূর্ণী, ইছামতী, মাথাভাঙা, গোরাগাঙনি, অঞ্জনার প্রসারিত জমিতে নীলচাষের রমরমা। হবসন এক ক্ষমতাশালী ও বড়োসড়ো নীলকর। রাণীনগর ছাড়াও তাঁর কুঠি ছিল বয়সাকুঠিসহ অন‍্যত্র। কিন্তু এই অঞ্চলের বন‍্যাপ্রবণতার জন্য প্রায় বেশিরভাগ জমিই জলে ডুবে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিলেন হবসন। তাঁর কানে যায় জাফর খাঁ-র অলৌকিক মহিমার কথা। হবসন এসে হত‍্যে দিয়ে পড়েন জাফর খাঁ-র মাজারে। এবং আশ্চর্য হলেও শোনা যায়, সে বৎসর অন‍্য নীলকররা বন‍্যায় যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নাকি হবসনের এলাকা জলমগ্ন হয়নি। আর একারণে কৃতজ্ঞ হবসন ইঁট-বালি-সিমেন্টে পাকা করে দেন মাজার। পরবর্তীকালে এই মাজারকে কেন্দ্র করে হিন্দু- মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনমেলা গড়ে উঠেছে চুর্ণীপাড়ের জমাদারতলায়। একদিনের এই মেলা ফাল্গুনী পূর্ণিমায় বসে ( স্মৃতি থেকে লিখলাম। একটু ভুল হতে পারে।)। গ্রামীণ অন‍্য মেলাগুলোর তুলনায় এই মেলা একটু স্বতন্ত্র। এখানে মানতকারীরা আসে ঐ মেলার দিনেই। সঙ্গে নিয়ে আসে চাল, ডাল, সব্জি ; আর রান্না করার সরঞ্জাম। এখানেই তাঁরা রান্না করে খাওয়াদাওয়া শেষ করেন। পীরের মাজারে অর্পণ করেন শ্রদ্ধাঞ্জলি। দোকান থাকে, ইদানিং বোলান, বাউলসহ গানের আসর বসে। এটা যুক্ত হয়েছে পরে। কিছুকাল আগে মেলাটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পাশের কৃষ্ণপুর গ্রামের যুবকদের উদ‍্যোগে এই মেলা নতুন করে শুরু হয়েছে শুধু নয়, মাজারটিও সংস্কার করা হয়েছে।
ফিরছি আমি। অনেকেই ভাবছেন, এক গ্রামীণ পীরের অলৌকিক ঘটনা প্রচার করে আমি কি সময়কে অন্ধকারের দেশে নিয়ে যেতে চাইছি। না, একদম তা নয়। বাংলাদেশে পীরবাদের জন্মই হয়েছিল মুসলমান বাঙালির ইহলৌকিক নানা আকাঙ্খা পুরণের স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু এইসব মানবপীরেরা কতটা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে মানুষের হিতে কাজ করতেন, তার সত‍্যতা যাচাইয়ের ক্ষমতা আমার নেই। ইচ্ছে করলেই আমি পারবো না তাঁদের কীর্তিকলাপ থেকে অলৌকিকতার চাদরটা সরিয়ে নিতে। কিন্তু যা পারি, তা এই ধর্ম নিয়ে হানাহানির এই দেশে  মনে করিয়ে দিতে ধর্মের নামে বিরোধের নাম বাংলা নয়।এই বাংলার পীরের দরগা আমবাঙালির নির্ভরতার জায়গা হয়ে উঠেছিল ধর্মের ছুৎমার্গের অনেক উপরে মানুষকে ‘মানুষ’ রূপে সত‍্য জেনে। তাই পীরসাহেব জাফর খাঁ আমার স্বকীয়া জীবনবৃত্তের বাইরে পরকীয়া অভিমানী প্রেমিক। বিরোধের বিষন্ন শীতঘুমে তিনি বড়ো একা। তাঁকে এই ঘুম থেকে জাগানোর চেষ্টা শুধু নয়, আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে খুব।
গৌতম অধিকারী : কবি, লেখক ও সম্পাদক। কলকাতা, ভারত।

আরো পড়তে পারেন…

বিজয় দিবসের উপলব্ধি ও প্রার্থনা : তুষার গায়েন

মুচিপাড়ায় কুকুরদের জীবনে কেয়ামত নেমে আসা সেই সকালের গল্প: লুৎফর রহমান রিটন

About the author

নরসুন্দা ডটকম