মানুষ- সমাজ

মহামারী করোনা ও গণমাধ্যমকর্মীদের হাহাকার : মাজহার মান্না

নরসুন্দা ডটকম   April 12, 2020
মহামারী

বৈশ্বিক করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়ানো প্রতিহত করার জন্য পৃথিবীর প্রায় সব দেশ কোনো না কোনো পর্যায়ের বিচ্ছিন্নকরণ পদক্ষেপ নিয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় আমরা অনেকগুলো নতুন শব্দের সাথে পরিচিত হয়েছি। যেমন-‘কোয়ারেন্টাইন’, ‘লকডাউন’ ইত্যাদি।

যখন কোনো ব্যক্তি কোনো সংক্রমণের শিকার হন; তখন তাকে সম্পূর্ণ আলাদা করে রাখার যে ব্যবস্থা তাকেই বলা হয় কোয়ারেন্টাইন, বাংলায় ‘সঙ্গরোধ’। এ রকম অবস্থায় আক্রান্ত ব্যক্তি সম্পূর্ণ আলাদা থাকবেন, তার সাথে যোগাযোগ হবে বিশেষ ব্যবস্থায়।

মানুষ মানুষের জন্য। এখন বেঁচে থাকার লড়াইয়ে টিকে থাকার বড় প্রশ্ন সবার কাছে। সবাই বলে সেভ (নিরাপদে) থাকবেন, বাসায় থাকবেন। কোথাও যাবেন না। করোনা প্রাদুর্ভাবের এই সময়ে রাষ্ট্রের এমন বিধি-নিষিধের কারণে মানুষও যেন বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া আর ঘরের বাইরে বের হচ্ছে না। কর্মক্ষয় লোকজন পেশায় নিয়োজিত থাকতে না পারায় তাদের উপার্জন বন্ধ হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের পাশাপাশি বিপাকে পড়েছেন গণমাধ্যমকর্মীরাও। তবুও তারা একপ্রকার জানবাজি রেখে ঠিকই এই সময়ে তাদের কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে মূলধারার গণমাধ্যম ও সাংবাদিকরা সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য পরিবেশন করে রাষ্ট্র ও মানুষের উপকারে আসছে

করোনার কারণে সামাজিক দূরত্বের পাশাপাশি কি মানবিক মূল্যবোধের দূরত্ব বেড়েছে? না। অনেকেই এই সময়ে সাহায্যেরে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। গরিব-অসহায় মানুষের বিপদে সাহায্য-সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় কাজ। কিন্তু মহামারীর এই ক্রান্তিকালে বেশির ভাগ গণমাধ্যমকর্মী আছেন মহাসংকটে। তাদের যেন কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। সমাজে ও রাষ্ট্রের কাছে বরাবরই তারা যেন অবহেলিত থাকছেন।

গণমাধ্যমকর্মীদের অবস্থা এমন যে, তারা যেমন নিচেও নামতে পারছেন না, উপরে উঠার রাস্তাই নেই তাদের। এই পেশাজীবীদের সিংহভাগই নিজের প্রতিষ্ঠান দ্বারাই নিষ্পেষিত। অনেক গণমাধ্যমেই টানা বেতন-ভাতা বকেয়া রয়েছে। চলমান মহামারীতেও মালিকপক্ষের মন গলেনি।

খোঁজখবরও নিচ্ছে না। এমন অবস্থায় কর্মরত গণমাধ্যমকর্মীদের খবর কেউ নিচ্ছে না। তাদের মধ্যে চলছে চরম হাহাকার। এখনই অনেকের পরিবার নিয়ে চলা দায় হয়ে পড়েছে। তাদের নিয়ে ভাবারও কেউ নেই মনে হয়। তবে এক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও মিডিয়া মালিকপক্ষের কাছে স্বজাতি নেতৃবৃন্দ দাবি নিয়ে আহ্বান জানিয়েই যেন তাদের দায়িত্ব শেষ করছেন। যা আইওয়াশ বলেই মনে হয়।

পড়তে পারেন….

করোনা ভাইরাসঃ যাদের ঘরে থাকারও কোনো উপায় নেই

বিশ্ব রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও আমার ভাবনা : উপল হাসান

বলা হয়ে থাকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হচ্ছে ‘গণমাধ্যম’। কিন্তু এটি কী শুধু কথায় আর কাগজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে! রাষ্ট্রের কাছে সকল গণমাধ্যমকর্মীর এমন প্রশ্নবাণ জুড়ে দেয়ার বোধহয় মোক্ষম সময়। কেননা এই দুর্যোগে কেউ চাক বা না চাক সাংবাদিকরা যে কোনো পরিস্থিতিতে যুদ্ধের ময়দান ছাড়তে জানে না। করোনায় অনেকে ঘরেবন্দি থেকে নিজেকে নিরাপদে রেখেছেন। কিন্তু মরণটা হাতে নিয়ে মৃতে্যুঞ্জয়ী এই গণমাধ্যমকর্মীরা সোস্যাল মিডিয়ায় যাতে কেউ গুজব রটিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে না পারে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখাসহ রাষ্ট্র ও সমাজ উন্নয়নের অংশীদার হয়ে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন। এরপরও এই দুঃসময়ে জরুরি সেবার তালিকায় সাংবাদিকরা নিজেদের নাম উঠাতে পারেনি! এই ভয়াবহ সংকটকালেও যেন তাদের খবর কেউ রাখেনা। তাদের মনের ভেতর বেদনার হিম কষ্ট জড়াজড়ি করে গলাপর্যন্ত আটকে আছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে তাদের প্রতিটি ঘরেই যেন শুধুই নীরব হাহাকার!

গণমাধ্যমকর্মীরা এতো ঝুঁকি নিয়ে দিন-রাত কাজ করেন রাষ্ট্র কি সে খবর রাখে না। যদি সে খবর রাষ্ট্রের জানা থাকে, তবে কেন করোনা মোকাবেলায় অন্যান্য পেশাজীবীর সাথে সাংবাদিকদের ঝুঁকি ভাতা নেই। সমাজমনস্ক ভাবনায় প্রতিদিন যে গণমাধ্যমকর্মীরা জীবন হাতে নিয়ে কাজ করছেন, তার কোনো উৎসাহ বা প্রণোদনা নেই। এখানেই শেষ নয়, কর্মের শেষে তাদের স্বীকৃতি পর্যন্ত নেই।

কিছুদিন আগে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার লম্বা লিষ্ট উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে সাংবাদিকরা কিছুই পায়নি। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে সেই খোঁজটা করতে পারিনা চক্ষু লজ্জায়। অথচ প্রধানমন্ত্রী জাতির সামনে তখন বলেছিলেন, যারা চাইতে জানে না তাদের সহায়তা করুন। আমরা আসলে কোনো দলে? চাইতে জানি না সেই দলে, নাকি হাঁ করে তাকিয়ে আছি সহায়তার জন্য সেই দলে? আমি তন্ন তন্ন করে গণমাধ্যমকর্মীদের কোনো দল খুঁজেও পাইনা।

তাই চলুন বেতন-ভাতাদি পরিশোধে তাদের বাধ্য করি। পাশাপাশি রাষ্ট্রের কাছে দাবি আদায়ে এই দুর্দিনে নিজেদের কল্যাণে ঐক্যবদ্ধ হই। নইলে অনাহারির কাতারে যাবেন ভুক্তভোগী গণমাধ্যমকর্মীরা। এ লক্ষে আসুন সকণ্ঠে আওয়াজ তুলি।

লেখক : দৈনিক জনকন্ঠের সাংবাদিক ও আয়কর আইনজীবী, কিশোরগঞ্জ।

আরও পড়তে পারেন…

লকডাউন ।। আমিনুল ইসলাম সেলিম

গোধূলি ।। খায়রুল বারী

অবাঙ্মানসগোচর ।। সত্যজিৎ রায় মজুমদার

About the author

নরসুন্দা ডটকম