ঈদ সংখ্যা ২০২০

চুপমানুষ ।। সুস্মিতা চক্রবর্তী

নরসুন্দা ডটকম   May 21, 2020
চুপমানুষ
কোন ম্যাজিকে মুহূর্তেরা ছুঁমন্তরের ফুল হয়, জানা নেই তার। সে শুধু জানে কোথায় যেন থাকে একটা চুপ। শব্দের কলবলানি নিরর্থক থেমে গেলে, পন্ডিতির ধুলো মরে এলে, আমাকে দেখুন এর হোর্ডিংগুলো মিলিয়ে গেলে, শান্ত হয়ে একটু বসতে দিলে ক্লান্ত মনের কাছে দাঁড়ায় এসে সেই চুপ।
রোজকার চেনা খেলনাপাতি নতুন লাগে তখন। ইস্টিশনের বাহান্নটা সিঁড়ি বেয়ে ওঠা ওভারব্রিজটার মাথায় এসে দাঁড়ায় ঘরফিরতি মেঘ। চুপমানুষের জন্য শেষ বিকেলের আকাশে হাত বাড়িয়ে দেয় একলা একটা চাঁদ, যাকে কক্ষনো খুঁজে পাবে না কোন বিক্রম। সে শুধু ওই মানুষটার।
অভ্যাসের রেললাইন পেরোয় শহর। তার শুধু লাল সবুজ সিগনাল। দিনান্তের দৌড় মিলিয়ে নিচ্ছে জরুরি বাজারের লিস্টি যখন, ওভার ব্রীজের উপর এসে দাঁড়ায় একটা আলসে সাঁঝবেলা। ছায়া ছায়া। তার গায়ে আজ ভর দিয়েছে চুপমানুষটা।  হাওয়ার খেয়ালে কথা বলে ব্রীজের সাথে যে বকুল গাছটা রোজ, আজ সে দেখছে কুচি কুচি করে সময় ওড়ায় চুপমানুষটা। 
একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে একটু আগে। নীচের পিচ রাস্তায় তাই ধেবড়ে আছে দোকানপাট, রাস্তার আলো। চ্যাঁভ্যাঁ দৌড় এইসময়ের যত, সব মুখস্থ রাস্তাটার। চেনা হয়ে গেছে তার ঘড়িবাঁধা যত মানুষের আর পাখিদের। সারাদিন ওই আকাশ কুড়িয়ে শেষমেশ ঘাড় গুঁজতে সেই ঘরেই ফেরে যারা। আজ সে রাস্তাটা  দেখছে ব্রীজের উপর একটা অন্যরকম ছায়া। একলা একটা গাছ যেন। এত বৃষ্টির পরেও ন্যাড়া। বাসা বাঁধেনি কোন পাখি। জন্মেই যেন ডালপালা মেলে খাঁখাঁ।
দাঁড়িয়ে পড়বে এমন সময় কার আছে! সক্কলের টিঁকি চক্করে বাঁধা। তাই যেতে যেতে চুপমানুষটাকে একটু ছুঁয়ে যায় ফুলঝুরি রঙ বিকেল। আবছায়া সাঁঝ আরেকটু গাঢ় হতে পাড়ি দেয় চকমকি আলোর বৃত্তের বাইরে। রহস্যময়ী হবে বলে মেঘের সন্ধানে যায় চাঁদ। এই বে আব্রু শহরে কোন রহস্য অবশিষ্ট নেই আর। ব্রীজের উপরে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায় একটা বিড়াল। আলসেমিটুকু তার কুড়িয়ে নেয় সন্ধ্যের বাতাস। এইবার এইখানে পা মেলে বসবে খুচরোকুড়োনো সারাদিনের বুড়িটা। সব মুখস্থ সন্ধ্যেটার। শুধু ভুল জায়গায় দাঁড়ি কমার মত তার চেনা লাইনে একটাই চিহ্ন আজ। একটা চুপমানুষ।
কোন ম্যাজিকে মুহূর্তেরা ছুঁমন্তরের ফুল, মানুষটা জানে না। শুধু জানে চুপ ছুঁয়ে দাঁড়ালে আজো ফোটে শিউলিরা। ন্যাড়া ডাল দেখে বাইরে থেকে বোঝা যায় না ঠিক অবশ্য সেটাই। বুঝতে হলে আরেকটু চুপছায়ায় ঘনিয়ে আসতে হয়।কেউ কোত্থাও অপেক্ষায় নেই তার জন্যে বলে যাচ্ছে চলতিফিরতি পথ। এত্তবড় ক্যানভাসেতে একফোঁটা খেয়ালের রঙ, একনিমেষের ফানুস, বলে গেল খসে যেতে যেতে একটি তারা। সব নদী নিজের খেয়ালে বয়ে যেতে দিলে বুঝি জন্মায় নিজস্ব জলধারাটি আবার। চুপের মধ্যে জেগে ওঠে চর। চরের মধ্যে তার ঘর। একার জন্য একা বাঁধভাঙা চাঁদনি রাত যেমন অলৌকিক প্রান্তর তেমন ঠিক তেমন, মাঝেমাঝে মানুষ চুপছায়া।
খাপছাড়া চিহ্নটি অনেকক্ষণ ধরে দেখছে ঘুম লেগে আসা বকুল গাছটা। আলোর ধোঁয়ায় জড়ানো মেঘেরা আর চক্করে টিঁকি বাঁধা সময়। দেখতে দেখতে তাদের একঘেয়ে লেগে যায়।খাপছাড়াটুকু সয়ে যায়।
গল্পের আশা ফুরোলে ঘুমিয়ে পড়ে সব। ততটুকু ধৈর্য ধরলে চুপ আরেকটু নিখাদ। পাঠক নেই, নেই কোন শ্রোতা কিংবা দর্শক। তখন বেজে ওঠে আশ্চর্য সুরবাহার, তার নিজের জন্য নিজের আলাপ। কোন ম্যাজিকে মুহূর্তেরা ছুঁমন্তরের ফুল হয় জানে না মানুষটা, শুধু টের পায় চুপমঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে জাদুকর, ঘুমন্ত চরাচরে আপনমনে দেখিয়ে চলেছে ভেল্কি একের পর এক তার।

লেখক : সুস্মিতা চক্রবর্তী, কলকাতা, ভারত
আমার দু’আনার নাট্যজীবন ও বালুরঘাটের নাট্যচর্চা : তুহিন শুভ্র মন্ডল
অস্তরাগ ।। সৈয়দ কামরুল হাসান
লাল পাসপোর্ট ।। গাজী মহিবুর রহমান

About the author

নরসুন্দা ডটকম