জাতীয়

হাওরজুড়ে শুধু্ই হাহাকার দিশেহারা কৃষক

নরসুন্দা ডটকম   এপ্রিল ২৯, ২০২৬

নরসুন্দা ডেস্ক: হাওরজুড়ে হাহাকার দিশেহারা কৃষক। টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় হাওরাঞ্চলে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল। এছাড়া পাহাড়ি ঢলের চাপে বাঁধ ভেঙে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে কৃষকের চোখের সামনেই তলিয়ে যাচ্ছে ক্ষেতের ধান। বৃষ্টি ও ঢলে হাওরে হু হু করে পানি বাড়ায় কষ্টের চদল বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছেন কৃষকরা। তবে প্রতিকূল আবহাওয়া, শ্রমিক সংকট ও কৃমিযন্ত্রের অভাবে ধান কাটা ব্যাহত হচ্ছে। বিস্তারিত প্রতিবেদকদের পাঠানো খবরে
কিশোরগঞ্জ: কিশোরগঞ্জে গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি, দমকা হাওয়া এবং ঘন ঘন বজ্রপাতে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের স্বপ্ন। গত রবিবার বিকাল থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত বৈরী আবহাওয়ায় তলিয়ে গেছে কয়েক হাজার হেক্টর জমির পাকা বোরো ধান। মাঠভরা সোনালি ফসল এখন পানির নিচে, আর কৃষকের চোখে কেবলই হাহাকার। জেলার অষ্টগ্রাম, ইটনা, নিকলী ও মিঠামইন উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টানা বৃষ্টিতে অষ্টগ্রাম উপজেলার খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর ও আদমপুর এলাকাসহ ইটনা, নিকলী ও মিঠামইন হাওরের কিছু এলাকায় কয়েক হাজার হেক্টর জমির পাকা বোরো ধান তলিয়ে গেছে। বজ্রপাতের আতঙ্কে অনেকেই মাঠে নামতে পারছেন না। কয়েক দিন আগেও যেখানে সোনালি, ধান দুলছিল, এখন সেখানে থইথই পানি। অনেক কৃষক কোমরপানিতে নেমে ধান কাটছেন। ধান কেটে নৌকায় করে পাড়ে আনা হচ্ছে। অতিরিক্ত শ্রমিক খরচ করে কোনো রকমে অনেকে ধান কেটে তুলছেন। কেউ আবার শেষ সম্বল হিসেবে ডুব দিয়ে কিছু পচা ধান কেটে কলাগাছের ভেলার ওপরে তুলে আনছেন। অনেক জমির ধান পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। আর যে ধান কয়েক দিনের মধ্যে ঘরে তোলার কথা ছিল, তা এখন পানির নিচে। হাঁটু বা কোমরপানিতে নেমে কেউ কেউ ধান কাটলেও অনেক কৃষকই আশা ছেড়ে দিয়েছেন।

মুখলেছ রোমান,সুনামগঞ্জ: টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিপাতে বিপাকে পড়েছেন সুনামগঞ্জের কৃষকরা। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় একদিকে হাওরাঞ্চলে নামছে পাহাড়ি ঢল, অন্যদিকে বৃষ্টির পানিতে হাওরে জলাবদ্ধতায় কৃষকের চোখের সামনেই তলিয়ে যাচ্ছে ক্ষেতের ধান। এদিকে জেলার মধ্যনগর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় পাহাড়ি ঢলের চাপে দুটি বাঁধ ভেঙে ফসলহানির ঘটনা ঘটে।বাঁধ ভেঙে ডুবে গেছে কৃষকের পাকা ধান। তাদের জগ্ন এখন হতাশায় ম্লান। মঙ্গলবার কিশোরগঞ্জে মিঠামইন উপজেলার বড় হাওর এলাকা
জানা গেছে, গতকাল সকালে অতিরিক্ত পানির চাপে মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের চান্দালীপাড়া গ্রামে ইকরাছই হাওরের একটি বাঁধ ভেঙে যায়। এতে বেশকিছু জমির ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কৃষকরা। এদিকে দেখার হাওরের গুজাউনি বাঁধও পানির তোড়ে ভেঙে গেছে। এছাড়া দুপুরে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার করচার হাওরের হরিমণের স্থায়ী ফসল রক্ষা বাঁধ উপচে হাওরে পানি ঢুকছিল। সকাল থেকে পাউবো কর্মকর্তাসহ স্থানীয়রা ওই বাঁধে অবস্থান করছিলেন। তবে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় হাওরের বিভিন্ন ফসল রক্ষা বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে ফসলহানি ঘটতে পারে। তাই সব বাঁধে পাহারার ব্যবস্থা করার জন্য সব প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) লোকজনকে নির্দেশ দিয়েছে জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড। এদিকে আবহাওয়া অনুকূল না থাকায় ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানো নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা।

তাহিরপুর উপজেলার শনির হাওরের কৃষক জুয়েল মিয়া বলেন, নদীতে পানি বাড়ায় এই হাওর ঝুঁকিতে। বাঁধে যেকোনো সময় ফাটল ধরতে পারে। এখন ফাটল ধরলে আর রক্ষা নাই, সব জমির ধান তলিয়ে যাবে। এখনও অর্ধেক ধান কাটা বাকি আছে হাওরের। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যেও কৃষকরা মাঠে আছেন। চেষ্টা করছেন ধান তোলার। কিন্তু অতিরিক্ত বৃষ্টি বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এখন সবকিছুই আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করছে। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বলেন, যে দুটি বাঁধ ভেঙেছে, সেগুলো পানি উন্নয়ন বোর্ড মেরামত বা নির্মাণ করেনি। এগুলো স্থানীয়রা নির্মাণ করেছেন। জেলার সব নদ-নদীর পানি এখনও বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে
বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে।
তনয় হোসেন ছোটন,নেত্রকোণা: জেলার হাওরাঞ্চলে থাকা কাঁচা-পাকা বোরো ধান নিয়ে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। কয়েক দিন ধরে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাতে তলিয়ে গেছে ধান। বজ্রপাতের ভয়ে হাওরে নামছেন না কৃষক। কিন্তু শ্রমিক ও ধান কাটার মেশিন সংকটে বাধ্য হয়ে বুঝুঁকি নিয়ে তলিয়ে যাওয়া ধান কেটে ঘরে তুলছেন অনেক কৃষক। গতকাল বিকালে জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কান্দিউড়া ইউনিয়নের উগারিয়া হাওরে সরেজমিন

গিয়ে কথা হয় কৃষক শাহজাহান মিয়া ও ফজলুর রহমানের সঙ্গে। তারা জানান, উগারিয়া হাওরে পানি জমে ধান তলিয়ে যাচ্ছে। ধান কাটা মেশিন ও শ্রমিকও পাচ্ছি না। তাই নিজেরাই পানিতে নেমে ধান কেটে নৌকায় করে ঘরে তোলার চেষ্টা করছি। সময়মতো ধান কেটে ঘরে তুলতে পারছি না। এবার উৎপাদন খরচটাও তুলতে পারব না।

সমীরণ দাশ,মৌলভীবাজার: গত দুদিনের অব্যাহত ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় ৭০ হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। পাশাপাশি নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় মাঠের ফসল ঘরে তুলতে না পারায় কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এ বছর উপজেলায় প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। গত দুই দিনের টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে কেওলার হাওরসহ উপজেলার ৭০ হেক্টর ফসলি মাঠ নিমজ্জিত ও ৩০০ হেক্টর আংশিক নিমজ্জিত হয়েছে। কৃষক আনোয়ার খান জানান, হাওরের সকল ধান ডুবে গেছে। অনেক কৃষক ঋণ করে ধান চাষ করলে পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তাদের স্বপ্নও ডুবে গেছে। ধান দীর্ঘ সময় পানিতে নিমজ্জিত থাকায় ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কৃষকরা।

সেলিম রানা,হবিগঞ্জ: টানা ভারী বর্ষণে জেলার হাওরাঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে বোরো ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। একদিকে জমিতে পাকা ধান, অন্যদিকে শ্রমিক সংকটের কারণে কৃষকরা সোনালি ফসল গোলায় তুলতে পারছেন না। এ ছাড়া ঘন ঘন বৃষ্টির কারণে জমিতে পানি আসায় কম্বাইন্ড হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা যাচ্ছে না। এতে এ বছর উৎপাদন ব্যয় তুলতে পারবেন কি না তা নিয়ে সংশয়ে আছেন কৃষকরা। ফসল হারিয়ে অনেক কৃষক দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। জেলা প্রশাসক ড. জিএম সরফরাজ বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে এবং দ্রুত সহায়তার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

About the author

নরসুন্দা ডটকম

Leave a Comment